বুক রিভিউঃ ইউসুফ বিন তাশফিন, নসীম হিজাযী
লেখক পরিচিতি
নসীম হিজাযী উর্দু সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট লেখক। তিনি মূলত তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলোর জন্যই সর্বাধিক পরিচিত। তিনি মুসলিম ইতিহাসের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য চরিত্র ও ঘটনা নিয়ে লেখার মাধ্যমে মুসলিম ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলে। তাঁর লেখা উপন্যাস "ইউসুফ বিন তাশফিন" এমনই একটি অসাধারণ উপন্যাস যা এখনো পর্যন্ত পাঠকদের শিরদাঁড়া করে তুলে।
প্রধান বিষয়বস্তু
বইটির মূল বিষয়বস্তু হলো সাহসিকতা, নেতৃত্ব, এবং ইসলামের সঠিক অনুশীলন। ইউসুফ বিন তাশফিনের জীবন ও কাজের মাধ্যমে ইসলামের ন্যায়বিচার, সামাজিক সমতা এবং দৃঢ় নেতৃত্বের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
“কর্ডোভার সম্ভ্রম ও আজাদি হরণ করার জন্য টলেডু থেকে একদল ডাকাত এসেছিলো। কর্ডোভাবাসী এ ডাকাতদের বিরুদ্ধে লড়ছিল। এসময় সেভিল থেকে একদল চোর বন্ধুর মুখোশ পরে এখানে প্রবেশ করে। কর্ডোভাবাসী এ চোরের দলকে তাদের সম্ভ্রম ও স্বাধীনতার রক্ষক মনে করে নিজেদের ঘরে স্থান দেয় এবং ডাকাতদের সাথে চূড়ান্ত লড়াই করার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে যায়। ডাকাতদলকে তাড়িয়ে ঘরে ফিরে তারা দেখতে পায় তাদের ঘর চোররা দখল করে বসে আসে।”
কাহিনী সংক্ষেপ
“কোন জাতি যখন বেঁচে থাকার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে তখন অপসাহিত্য ও অপসংস্কৃতি আফিমের নেশার মতো কাজ জাতীকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তাই এসব শাসকদের দরবারে জ্ঞানীগুণী লোকদের পরিবর্তে জায়গা পায় চাটুকার, কবি, গায়ক ও ভাঁড়রা।”
হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিকে স্পেন বিশটি খন্ডরাজ্যে বিভক্ত হয়ে গেলে মুষলধারে বৃষ্টির মতো স্পেনের মুসলমানদের ওপর নেমে আসে বিপদ ও মুসিবতের তুফান। নির্যাতিত জনগণ অধীর হয়ে উঠলো একজন উদ্ধারকারীর অপেক্ষায়। কর্ডোভা, সেভিল ও গ্রানাডার আলেমরা যখন হতাশায় জর্জরিত, সারা দুনিয়ার মুসলিম জাতি যখন নিষ্প্রাণ পাথরের মতো বসে আছে ঠিক সে সময় আফ্রিকার মরুচারীদের জরাজীর্ণ কুটীরে জ্বলে উঠলো আশার বিদ্যুৎকণা, জেগেছে উঠেছে এক নতুন শক্তি, আফ্রিকার দিগন্ত রেখায় ধূলিঝড় উড়িয়ে ছুটে এলো এক ঘোড়সওয়ার। আর যিনি এই হতাশাগ্রস্ত জাতীকে জাগিয়ে তুলেছেন তিনি হলেন রাবাতের আমীর ইউসুফ বিন তাশফিন। তার সঙ্ঘি হল এমন একদল গাজী যাদের খুরধার তরবারি ইসলামের নতুন দুশমনদের জন্য বয়ে আনতো মৃত্যুর পরোয়ানা।
“যে কবিরা একদিন তাদের কবিতা দিয়ে জাতিকে শুনাতো জাগরণী মন্ত্র, আশা আর উদ্দীপনার প্রাণ বন্যায় মাতিয়ে তুলতো যুব শক্তিকে, অগ্রগতির নকীব হয়ে ঘুরে বেড়াতো জনপদ থেকে জনপদে, তারাই যখন মেতে উঠলো অযোগ্য শাসকদের প্রশংসা গানে, তখন আশার আর কিছু রইলো না সেখানে। কবিরা জাতির বিবেক না হয়ে নিজেদের বিবেক যদি বিকিয়ে দেয় অন্যের কাছে, তখন সে জাতিকে ধ্বংসের পথ থেকে ফিরে আসার জন্য ডাক দেয়ার আর কেউ থাকে না।”
আফ্রিকার দূর দূরান্তের বিভিন্ন এলাকাগুলোতে যেসব ওলামা, ফকিহ, ও মুবাল্লিগ মানুষের মনে ইসলামের আলো জালানোর চেষ্টা করেছিলেন, ইউসুফ বিন তাশফিনের তলোয়ারের চমকের সাথে তার মহিমান্বিত গুণের চমকে চমকে উঠলেন তারা। যার সততা, বিচক্ষণ চিন্তাশক্তি, ইসলামি নিয়মানুসারে জীবনযাপন পদ্ধতি, সাম্য, সুন্দর ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি সুদূর আফ্রিকাকে ছাড়িয়ে স্পেন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। তাছাড়া উপন্যাসটি ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সামরিক অভিযান ও রাজনৈতিক কৌশলের উপর ও ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
বার্তাবহ
একতা এবং দৃঢ়তা
উপন্যাসটির মূলভাব হল একতা ও দৃঢ়তা। ইউসুফ বিন তাশফিনের নেতৃত্বে বিভিন্ন মুসলিম- অমুসলিম গোত্রের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার পাশাপাশি তা সফল হওয়ার যে গল্প তা যে কারোরই জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়।
“কবরের নিঝুম পুরীতে ঘুমিয়ে থাকা মুজাহিদদের রক্ত দিয়েই জাতির আজাদি ও ইজ্জতের ইতিহাস লেখা হয়।”
নৈতিকতা এবং নেতৃত্ব
এখানে লেখক ইউসুফ বিন তাশফিনের জীবনের মাধ্যমে নৈতিকতা ও নেতৃত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তার চরিত্রে প্রতিফলিত নৈতিকতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলী যা এই যুগের তরুণ মুসলিমদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস।
“যে জাতি সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে সরে দাঁড়ায়, সে জাতির কোলেই মামুন জান্নুন, ইয়াহইয়া আল কাদির ও ইবনে আক্কাশার মতো লোক জন্মায়। তারা সভ্যতার দুশমন, মনবতার দুশমন। জনগণ যখন ভন্ড ও প্রতারক শাসকদের সহ্য করে নেয় আল্লাহ তখন সে জাতির ওপর থেকে রহমত ও বরকত উঠিয়ে নেন। আর যে জাতি সততা ও নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ্র পথে অবিচল থাকে, তাদের মধ্যে আল্লাহতায়ালা তারিক, জিয়াদ ও আব্দুর রহমানের মতো নেতা ও সেনাপতির জন্ম দেন। দুনিয়ার দাম্ভিক আজদাহা তাদের সামনে লুটিয়ে পড়ে। বিজয়ের পর বিজয় এসে তাদের পদচুম্বন করে। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ জাতিকে নিয়ে যায় উন্নতি ও অগ্রগতির পথে।”
ধর্মীয় বিশ্বাস
এখানে ধর্মীয় বিশ্বাস ও আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসের গুরুত্বও তুলে ধরেছে। ইউসুফ বিন তাশফিনের জীবনে ধর্মীয় অনুশাসনের ভূমিকা ও তার ধর্মীয় জীবনযাপনের পদ্ধতি সকল মুসলমানদের জন্য একটি মডেল হিসেবে কাজ করে।
শিক্ষা প্রভাব
বইটি শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়, বরং একটি শিক্ষামূলক গ্রন্থও। উপন্যাসটি মুসলিম নারী- পুরুষদের তাদের ইতিহাসের প্রতি গর্ববোধ করতে ও তাদের নিজেদের জীবনে নৈতিকতা, নেতৃত্ব এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। তাছাড়া বইটি পাঠকদেরকে তাদের নিজেদের ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়ার সাথে সাথে তাদের মধ্যে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
নারী শক্তি ও ভালোবাসা
সকিনা, মায়মুনা, তাহেরা ইত্যাদি চরিত্রগুলো তে লেখক যে পরিমাণ মানসিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন তা সত্যিই বিরল। কারণ যেখানে সকিনা তার নিজের জীবনের সকল মায়া মমতা, ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে পরের তরে নিজ স্বামী- সন্তান কে যুদ্ধ ময়দানে পাঠিয়েছেন শুধুমাত্র স্পেন কে দুশমনদের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য। শুধু সকিনা ই না, তার সাথে যুক্ত হয়েছে মায়মুনা ও তাহেরা। স্বামীর প্রতি অপরিসীম ভালোবাসাকে তারা পেছনে ফেলে সমস্ত স্পেনবাসীকে মুক্ত করাই যাদের জীবনের প্রথম ব্রত ছিল।
চরিত্র চিত্রণ
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ইউসুফ বিন তাশফিন একজন সাহসী, ন্যায়পরায়ণ এবং কৌশলী নেতা। তাঁর চরিত্রে দৃঢ় বিশ্বাস, উচ্চ নৈতিকতা এবং অপরিসীম সাহসিকতা প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি শুধু একজন সফল যোদ্ধাই নন, বরং একজন দক্ষ রাজনীতিবিদও ছিলেন। ফলে আফ্রিকা থেকে স্পেন পর্যন্ত সকল গোত্র ও গোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
অন্যান্য প্রধান চরিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে, আব্দুল মুনিম, সাদ ইবনে আব্দুল মুনিম, আহমদ ইবনে আব্দুল মুনিম, হাসান ইবনে আব্দুল মুনিম, সিয়ার ইবনে আবু বকর, মুতামিদ, আলফান্সু, রশিদ, আম্মার, আবু জাফর, আলমাস, ইলিয়াস, সকিনা, তাহেরা, মায়মুনা, ইদ্রিস ইত্যাদি।
মূলত ইউসুফ বিন তাশফিনের সাথে জড়িত অন্যান্য চরিত্রগুলোও অনেক সুন্দরভাবে চিত্রিত করতে সক্ষম হয়েছেন লেখক। উপন্যাসে ইউসুফ বিন তাশফিনের সহযোগী, উপদেষ্টা এবং শত্রুরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিটি চরিত্রই মূল কাহিনীর প্রবাহকে সমৃদ্ধ করেছে ফলে যেকোন পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম হবে।
লেখার শৈলী
যদিও মূল বইটি উর্দু ভাষায় লেখা তবে অনুবাদক আব্দুল হক এবং সম্পাদক আসাদ বিন হাফিজ বইটিকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য পাঠ্যযোগ্য করেছেন। তাদের
অনুবাদের শৈলী সহজবোধ্য ও বর্ণনামূলক হওয়ায় মূল বইয়ের প্রতি সুবিচার করেছেন বলে আমার মনে হয়। তাছাড়া নসীম হিজাযী বইটিতে পাঠকদের জন্য একটি প্রাণবন্ত এবং বাস্তবসম্মত চিত্র আঁকতে সক্ষম হয়েছেন। তার বর্ণনায় ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর সঠিকতা ও কল্পনাশক্তির মিশ্রণ রয়েছে, যা পাঠকদের মনে গভীর ছাপ ফেলতে সক্ষম।
পরিবেশনা
উপন্যাসটির পটভূমি স্পেন ও স্পেনের বিভিন্ন খন্ডরাজ্য, মরোক্কোর বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত। বইয়ে লেখক সেসব স্থানগুলোর বিবরণ এতোটাই স্পষ্ট করে লিখেছেন যে যেকোন পাঠক সহজেই সেই সময়ের পরিবেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারেন। বইটিতে যুদ্ধক্ষেত্র, নগর এবং প্রাসাদের বিবরণগুলোও বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
শেষকথা
"ইউসুফ বিন তাশফিন" একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক উপন্যাস যা মুসলিম ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরেছে। নসীম হিজাযী’র চমৎকার লেখনী ও আব্দুল হক এর চমৎকার অনুবাদ যেখানকার ঐতিহাসিক বর্ণনা পাঠকদেরকে মুগ্ধ করবে এবং তাদেরকে একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। এই উপন্যাসটি শুধু অতীতের ঘটনাগুলোর প্রতিফলন নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে কাজ করে।
ব্যক্তিগত অভিমত
“ইউসুফ বিন তাশফিন” পড়ে অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছি। নসিম হিজাজির লেখা এটা আমার পঠিত দ্বিতীয় বই। এই বইটি একটি প্রেরণাদায়ক উপন্যাস যা ইসলামী ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে পুনরায় জীবন্ত করে তুলেছে। ইউসুফ বিন তাশফিনের চরিত্র এবং তার নেতৃত্বের গুণাবলীর পাশাপাশি অন্যান্য চরিত্রগুলো আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। যেখানে ইসলাম নুয়ে পড়া শুরু করবে সেখানে ইউসুফ বিন তাশফিন একটি জাগরণী মন্ত্র হিসেবে কাজ করবে বলে আমার বিশ্বাস। তাছাড়া বইটির অন্যতম বড় দৃঢ়তা হলো লেখকের বর্ণনাশৈলী এবং চরিত্রের গভীরতা। ইতিহাসপ্রেমী পাঠকদের জন্য এটি একটি অবশ্যপাঠ্য বই। শুধু ইতিহাস প্রেমীদের জন্য নয়, বরং যারা নেতৃত্ব এবং ন্যায়বিচারের কাহিনী পড়তে পছন্দ করেন, তাদের জন্যও এটি একটি অবশ্যপাঠ্য বই।


