বুক রিভিউঃ সীমান্ত ঈগল, নসীম হিজাযী
লেখক পরিচিতি
আসল নাম ছিল শরীফ হুসাইন। জন্ম ১৯১৪ সালে। তিনি ছিলেন একজন পাকিস্তানি উপন্যাসিক ও লেখক, যিনি লেখালেখির সময় নসিম হিজাযী ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন এবং এই নামেই অধিক পরিচিত। তিনি উর্দু ভাষার লেখক ছিলেন। হিজাযী পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলার ধারওয়াল শহরের পাশের গ্রাম সুজানপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পূর্বেই ১৯৪৭ সালে তার পরিবার লাহোরে বসবাস শুরু করে। জীবনের অধিকাংশ সময় পাকিস্তানে কাটিয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সীমান্ত ঈগল
জীবনে বহু থ্রিলার আর অ্যাডভেঞ্চারের বই পড়েছি, তবে সত্য যে তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে তা এই প্রথম উপলব্ধি করলাম সীমান্ত ঈগল পড়ার মাধ্যমে। বইটিতে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে এক অসীম সাহসিকতা, ভয়ংকর বিশ্বাসঘাতকতা আর ট্র্যাজেডির এক মহাকাব্য।
চরিত্রসমূহ
বদর, মুসা, বশীর, আল জাগল, জায়গারা, আবুল হাসান, মন্সুর, আবু দাউদ, ইঞ্জিলা, রাবিয়া, মিরা, ফার্ডিনেন্ড, ইসাবেলা, জন মাইকেল, ডন লুই, এবং আবু আব্দুল্লাহ ইত্যাদি।
কাহিনী সংক্ষেপ
গ্রানাডার দুর্বল নেতৃত্ব, সিদ্ধান্তহীনতা আর আপোষে আস্থা হারিয়েছে মুসলিম রা। তখন সমগ্র স্পেনে ব্যতিক্রম হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল গ্রানাডার সীমান্তবর্তি একটি ক্ষুদ্র রাজ্য, জীবন বাজি রাখা কিছু অকুতোভয় মুজাহিদ আর কয়েক হাজার চরিত্রবান মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ। গ্রানাডার সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল বটে, তবে সেখানকার নেতৃত্বের প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে তারা গড়ে তুলেছিল স্বাধীন এক উপত্যকা- যারা ফার্ডিনেন্ডের সাথে অন্যায় আপোষ আর ষড়যন্ত্র মূলক চুক্তিগুলো প্রত্যাখ্যান করে নিজেরাই একা লড়তো সম্মিলিত খৃষ্টান শক্তির বিরুদ্ধে। সেই ক্ষুদ্র উপত্যকা আর জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে ছিলো এমন এক তরুণ মুসলিম বীর, যার নাম ধরে ধরে স্পেনের ইসলামের ইতিহাসের শেষদিকের সকল মুসলিম আল্লাহ্র কাছে কাঁদত, ফরিয়াদ জানাত। তার নাম ছিল বদর বিন মুগীরা। বদর হল সেই মুগীরারই বীর সন্তান। তাঁর সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে স্পেনের এক কাউন্ট তাঁকে 'সীমান্ত ঈগল' হিসাবে উপাধি দেন।
মুগীরা’র মৃত্যু
মুসলিম স্পেন তখন আত্মকলহ আর ষড়যন্ত্র জর্জরিত এক জনপদ। দুর্ভাগা জাতির নেতারা এক না হয়ে বরং ফার্ডিনেন্ডের কাছে নিজেদের পরাজয়ে উল্লসিত। এমন সময়ে একজন তাকওয়াবান মুসলিম গোত্র নেতা মুগীরা রুখে দাঁড়ান অটল হয়ে। এক সময় তার নেতৃত্ব আবারও স্পেনের মুসলিমদের আশার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। মুগীরাকে ধ্বংস করার আক্রমণে একের পর এক পরাভূত হয়ে হতাশ ফার্ডিনেন্ড এবার জাল ফেলে এক মুসলিম নামধারী মুনাফিক আলিমের দ্বারা। আবু দাউদ নামের সেই আলিম কর্মীবাহিনী সংগঠিত করার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে মুগীরাকে একদিন সেভিল ডেকে নিয়ে যায়। আবু দাউদ নিজে উপরে উঠার জন্য তার পথের বাঁধা কে উপহার হিসাবে নিরস্ত্র মুগীরাকে তুলে দেয় ফার্ডিনেন্ডের হাতে। একদিন শহরের চৌরাস্তায় ফাঁসী দেয়া হয় মুগীরাকে। নিভে যায় স্পেনের ইসলামকে জ্বালিয়ে দেয়ার একটি বারুদ। অসহায় জাতি মুগীরার জন্য অশ্রু বিসর্জন দিয়ে দেখতে থাকে একের পর এক পরাজয়।
“খোশামোদি দিয়ে নয়, আজাদি খরিদ করতে হয় খুন (রক্ত) দিয়ে।”
ফার্ডিনেন্ডের গ্রানাডা কব্জা করার পায়তারা
গ্রানাডার সে সময়কার শাসক ছিল আবুল হাসান। জাতির দুঃসময়ে এই শাসক একদিন সকল প্রাসাদ ষড়যন্ত্র তুচ্ছ করে ফার্ডিনেন্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেন। পিপাসার্ত জাতির জন্য এ ছিল শীতল প্রস্রবণের মতো সুখকর খবর। গ্রানাডা ও স্পেনের মুসলিম ইতিহাসের শেষ আল্লাহ্ ভীরু সেনাপতি মুসা বিন আবি গাসসান নেমে পড়েন সেনাদল গোছানোর কাজে। আবুল হাসানের যুদ্ধ ঘোষণার পর প্রথম তিনি কয়েকজন সঙ্গী সহ এসে দাঁড়ান এক তরুণের কাছে- বদর বিন মুগীরা, সীমান্ত ঈগল। বদর নিজের খ্যাতি বা রাজা হবার জন্য লড়তেন না। আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ছাড়া তাঁর আর কোন উদ্দেশ্য ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে গ্রানাডার নেতৃত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা বদর আল্লাহ্র কাছে শুকরিয়া করে নিজের বাহিনীকে যুক্ত করেন গ্রানাডার সঙ্গে। বদর আর গ্রানাডার মিলিত সেনাদল তাদের সামান্য ফৌজ নেমে পড়ল ফার্ডিনেন্ডের বিশাল ফৌজের বিরুদ্ধে। আল্লাহর কৃপায় একের পর এক অসাধারণ জয় আসতে লাগল তাদের। ফার্ডিনেন্ড পিছু হঠতে বাধ্য হলো। সমরাঙ্গনের সব যায়গায় ব্যর্থ হয়ে ফার্ডিনেন্ড এবার নামাল তার বহু পুরোনো এক বিশ্বস্ত অস্ত্র যার নাম আবু দাউদ।
“কোন জাতি যখন আজাদি, ইজ্জত আর মুক্তির পথ ধরে চলতে চায়, জ্ঞান বিজ্ঞান তখন চাবুকের কাজ করে। এ পথ থেকে সরে গেলে তা হয় নেশাযুক্ত ঔষধ। দায়িত্বহীনতার জন্য যা বিবেকের দংশন থেকে রক্ষা করে।”
আবু দাউদের গ্রানাডা যাওয়ার উদ্দেশ্য এবং সীমান্ত ঈগল পৌঁছানো
গ্রানাডার শাসক আবুল হাসানের পরিবারে দ্বন্দ্ব তৈরীর মিশনে আবু দাউদ ফার্ডিনান্ড এর কথা মতো রওয়ানা হলো গ্রানাডার উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে দুর্ঘটনায় পড়ে তাকে ও তার স্ত্রী সহ দুই কন্যা বহনকারী টাঙ্গা এসে পড়ল অজানা এক এলাকায়। আহত আবু দাউদ ও তার পরিবার আবিষ্কার করল তারা আর কোথাও নয়, এসে পড়েছে সীমান্ত ঈগলের উপত্যকায় নিজেদের সাজানো চক্রান্ত মোতাবেক। কথামতো চতুর আবু দাউদ খৃস্টানদের হাতে নির্যাতিত হবার মিথ্যা কাহিনী ফেঁদে সবাইকে তাদের প্রতি সহানুভূতুশীল করে তুলল। বদর আর বশীর নিজে উপস্থিত থেকে মেহমানদারী করল তাদের। বিশ্বাসঘাতক আবু দাউদের প্রথম স্ত্রী ছিল মুসলিম। এবং তিনি মারা যান বড় কন্যা রাবিয়াকে রেখে। পরিবারে ছিল তার দ্বিতীয় স্ত্রী, যিনি ছিলেন খৃস্টান। এই স্ত্রীর ঘরে জন্মেছিল তার দ্বিতীয় কন্যা ইনজিলা এবং সেও ছিল খৃস্টান। তবে বড় বোনের প্রতি গভীর মমতা থেকে সে ভালোবাসত ইসলামকে। আবু দাউদের দুই কন্যা ছিল ইসলামের প্রতি একনিষ্ঠ ও বাবার কাজে শ্রদ্ধাবান। একই সাথে সীমান্ত ঈগল ও বশীরের সঙ্গ তাদের মুগ্ধ করেছিল আর ভবিষ্যতের ব্যাপারে উৎকণ্ঠিত করে তুলেছিল।
“পথশ্রান্ত পথিক বিশ্রাম নেয় গাছের নিচে। ক্ষণিকের তরে মন ছুটে যায় তার পাখীর গানে। বিমোহিত হয় সুরের মূর্ছনায়। পাখী তার সফর সঙ্ঘি হবে, ভাবে না কখনো পথিক।”
বদরের বিপদে রাবিয়া’র পেরেশানি
পূর্ব আলোচনা মতো এক্টু সুস্থ্য হতেই আবু দাউদ তার খাচ পয়গাম নিয়ে পাঠাল একজন বিশ্বস্ত কোচওয়ান কে ফার্ডিনেন্ডের কাছে ঈগল উপত্যকায় হামলা করার জন্য। এই হামলার কথা রাতের অন্ধকারে তার স্ত্রী মিরা’র সাথে আলোচনাকালে রাবিয়া শুনতে পায় ফলে তার নাভিশ্বাস যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। সে সারারাত পেরেশানি’র মধ্য দিয়ে কাটিয়েছে, অপেক্ষা করেছে কি ভাবে এই হামলা’র কথা বদর কে জানানো যায়। ফলে সে এবং ইঞ্জিলা সকাল সকাল হাটার বাহানা করে বের হয়ে যায়। পথিমধ্যে তার সাথে বদরের দেখা হয় এবং রাবিয়া স্বপ্ন দেখেছে বলে হামলার ইঙ্গিত দিয়ে তাদের সাবধান থাকতে বলে।
রাবিয়ার মাত্রারিক্ত দুঃচিন্তা দেখে বদর বলে, “কওমের মেয়েদের এ ধরণের দুঃচিন্তা প্রকাশ করা উচিত নই। এতে পুরুষেরা কুঁড়ে যায়। তবুও আমি আপনার এ হামদরদীর শুকরিয়া আদায় করছি।”
বদরের প্রতি রাবেয়ার ভালোবাসা ইঞ্জিলা বরাবরই টের পেতো। তবে রাবিয়া তা অস্বীকার করতো। তার মতে-
“প্রেম মুখের কথা নয়। এ পবিত্র অনুভূতি থেকে তারা অনেক দূরে। কন্টক মাড়িয়ে কি লাভ? কোন কোন কাঁটার আঘাত বড়ই ব্যাথাতুর। তাতে দেহ রক্তাক্ত হয়, কিন্তু তার খবরও সে রাখে না।”
আবু দাউদের আলহামরা গমন
তিনি ঈগল উপত্যকার সবার মাঝে নিজেকে এমন ভাবে প্রকাশ করলেন রীতিমতো সবাই তাকে সত্যিকারের নির্যাতিত, নীপিড়িত একজন বিজ্ঞ মুসলিম হিসেবে বিশ্বাস করতে লাগলো। পথিমধ্যে রাবিয়া ও ইঞ্জিলা যে আহত হয়েছিলো তা সেরে উঠার পরপরই আবু দাউদ বদর কে জানায় তারা আলহামরা যেতে চায়। বদর ও তাদের যাওয়ার ব্যবস্থা শুরু করে। এক সময় ঈগল উপত্যকা থেকে ষড়যন্ত্রের নতুন জাল পেতে আল হামরার উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়ল আবু দাউদ।
অল্প সময়েই আল হামরায় আবুল হাসানের আতিথেয়তা আর রাজপরিবারের বিশ্বাস অর্জন করে নিল আবু দাউদ। আবুল হাসান একদিন বেরিয়ে পড়লেন ফার্ডিনেন্ডের বাহিনীর সাথে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে। আবু দাউদের হাতে তুলে দিয়ে গেলেন একমাত্র যুবক পুত্র আবু আবদুল্লাহর শিক্ষার ভার। ফার্ডিনেন্ডের সাথে আবুল হাসানের সম্মিলিত বাহিনীর বড় যুদ্ধ সংগঠিত হলো লোশা'র ময়দানে। বদর বিন মুগীরার কৌশল আর মুসা বিন আবি গাসসানের নিপুণ নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী অসাধারণ বিজয় লাভ করে। দীর্ঘদিন পর স্পেনের কোন মুসলিম জনপদে যুদ্ধ জয়ের নাকাড়া বেজে উঠে। হাজার হাজার উল্লসিত মুসলিম নারী পুরুষ রাস্তায় বেরিয়ে আসে। লোশা’র মুসলিম ফৌজ বিজয় সমাবেশ করছে, এমন সময় একটি খবর আসে রাজধানীর আল হামরা প্রাসাদ থেকে। আবু দাউদের ষড়যন্ত্রে আবু আবদুল্লাহ বাবাকে ক্ষমতাচ্যুত ঘোষণা করে নিজেকে সুলতান হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে, আর প্রধান উপদেষ্টার পদে নির্বাচিত করেছে আবু দাউদ কে। স্তব্ধ হয়ে যায় রাজধানী। আকাশ ভেঙে পড়ে ময়দানের মুজাহিদদের। আবুল হাসান নির্বাক হয়ে গেলেন কারণ যে ক্ষমতা আবু আবদুল্লাহ দখল করে নিয়েছে, তা এমনিতেই তার হতো পিতার উত্তরসুরী হিসাবে। জাতির ক্রান্তিকালের বিশ্বাসঘাতক এবং বুজদিল আবু আবদুল্লাহর হাতেই আল্লাহ্ শেষ লিখে দিয়েছিলেন স্পেনের মুসলিম জাতি তা টের পেয়েছিলো।
আবু দাউদের কথা মতো আবু আবুদুল্লাহ আবুল হাসানের হাতে বন্দী ফার্ডিনেন্ডের সকল দালালদের ছেড়ে দিলেন। তার ছোটবেলার বন্ধু ও মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি মুসা এলেন তার সাথে দেখা করে তাকে বোঝাতে। আল হামরা প্রাসাদে এসে আবু দাউদের নির্দেশে বন্দী হলেন মুসা। এরপর তার খবর জানলো না আর কেউই। আবু দাউদ কৌশলে বদর বিন মুগীরাকেও নিয়ে এলেন আল হামরায়। বন্দী করা হলো বদরকেও। মৃত্যু পরোয়ানা জারি হলো তার নামে। গ্রানাডাবাসী শুনলো বদরের মৃত্যুর খবর।
সে দিনই আবু দাউদ এই দৃঢ়, স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্ব বদর কে দেখেছে। গ্রানাডার সিংহাসন মূল্যহীন মনে হল আবু দাউদের কাছে। নিজের দিলকে প্রশ্ন করলো, দুনিয়ার কোন সম্পদ মানুষকে মওত সম্পর্কে এতো বেপরোয়া করতে পারে? কোন সে অনুভূতি? জীবনে প্রথম বারের মতো সে অনুভব করলো, মরণকে জয় করা দুনিয়ার সবচে বড় কামিয়াবি।
“ইসলাম আমাদের জন্য খুলে দিয়েছিলো উন্নতি ও সাফল্যের দরজা। কিন্তু সে দুয়ার আমরা বন্ধ করেছি নিজের হাতে। ইসলাম আমাদের জিহাদের হুকুম দিয়েছে- আত্মকলহে লিপ্ত হয়েছি আমরা, উদ্বুদ্ধ করেছে ঐক্যবদ্ধ হতে- বিভিন্ন ফেরকায় বিভক্ত হয়েছি আমরা। বংশ কৌলীন্যের অহমিকা ভেঙ্ঘে গড়েছে ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বুনিয়াদ- সে অন্ধ অহমিকা আবার আমাদের আচ্ছন্ন করে নিয়েছে। ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছেড়ে আমরা বংশ, ভৌগোলিক জাতীয়তার কাছে মস্তক অবনত করে দিয়েছি। অন্যায় ও অত্যাচার কে স্তব্ধ করে দেয়ার পরিবর্তে আমাদের তলোয়ার জড়িয়ে পড়েছে আত্মহননের কাজে। আজ দুনিয়ার এক বংশ আরেক বংশের সাথে, এক দেশের মুসলমান আরেক দেশের মুসলমান দের সাথে তরবারির তেজ পরীক্ষা করছে।”
আবু দাউদের পরিণতি
লোশা’র গভর্নর হওয়ার পর ফার্ডিনেন্ড তার কাউন্ট জন মাইকেল কে চিঠি নিয়ে পাঠায় আবু দাউদের কাছে। চিঠিতে আবু দাউদ কে কারডিজ পৌঁছার নির্দেশ দেয় ফার্ডিনেন্ড। সে অনুযায়ী আবু দাউদ রওয়ানা হবার পর জন মাইকেল ইঞ্জিলা’র প্রতি কু নজর পেশ করতে শুরু করে। এরই সুত্রপাত ধরে বিভিন্ন কৌশলে ইঞ্জিলাকে অত্যাচার করার প্ররোচনা চালায় এবং সার্থক হবার আগেই জন মাইকেলের বিনাশ ঘটে। এরই ফলশ্রুতিতে ফার্ডিনেন্ড প্রথমে রাবিয়া পরে ইঞ্জিলা কে জীবন্ত আগুনে দগ্ধ করার আহবান পেশ করে।
গ্রানাডার শাসক হবার স্বপ্ন দেখেছিলো আবু দাউদ। এ জন্যই সে নিকৃষ্ট খাহেশ ও নাপাক ইরাদা নিয়ে ঈগল উপত্যকা, আলহামরা আগমন করেছিল। কওমের লাশের উপর নিজের মহল করার খাহেশ ছিল তার। সে অনেক পূর্বেই মরে গেছে সে যখন থেকে একজন আলেম হয়ে ক্ষমতার লোভে মুসলমানদের সাথে গাদ্দারি করে খৃষ্টান দের সহযোগিতা করা শুরু করে। তবে সে তখনই আত্মহত্যা করতে বাধ্য হল, যখন মেয়েদের প্রতি রহমের দরখাস্ত নাকচ করে দিলো ফার্ডিনেন্ড। মৃত্যুর পূর্বে আবু দাউদ তার একের পর এক সকল অপকর্মের কথা চিঠির মাধ্যমে বদরের কাছে স্বীকার করে এবং রাবিয়া ও ইঞ্জিলা কে এই মৃত্যুর হাত থেকে উদ্ধার করার অনুরোধ করে।
“বাস্তব জগতে সবল-দুর্বলের চুক্তি মূল্যহীন। এ সন্ধি কমজোরকে পাবন্ধির জিঞ্জিরে আবদ্ধ করে। শক্তিমানকে দেয় তরবারি ধার দেয়ার মওকা।”
ইমানের দৃঢ়তা
সূর্য তখনো ডুবেনি। লোশা’র বাইরে খোলা এক ময়দানে ইঞ্জিলা ও রাবিয়া’র চিতার সামনে জমায়েত হল হাজার হাজার নারী- পুরুষ। তারা দু’জন খুঁটিতে পাশাপাশি বাঁধা ছিল। কারণ আজকে সূর্যাস্তের পরপরই তাদের চিতায় জ্বালানো হবে। এদিকে লোশা’র গভর্নর এবং বিশপ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে পশ্চিম দিগন্তে। সবাই জানত, সূর্যাস্ত পর্যন্ত ফার্ডিনেন্ডের হুকুমের অপেক্ষা করা হবে, রাজদূত নতুন কোন হুকুম না নিয়ে এলে চিতায় জ্বালানো হবে বহ্নি শিখা। জ্বলন্ত মশাল হাতে চিতার পাশে দাঁড়িয়ে রইলো দু’জন সিপাই।
পরিণতি সম্পর্কে সন্দেহ ছিলোনা রাবিয়া ও ইঞ্জিলা’র। এমতাবস্থায়, তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে দোয়া করে- “পুরস্কার আর শাস্তির অধীশ্বর ওগো! অটল অনড় থাকার তৌফিক দাও আমাদের। আমাদের দুর্বলতা তুমি দেখেছো, আমাদের কমজোরি তুমি জানো। কিন্তু এ দুর্বলতা, এ অসহায়ত্ব অপরের সামনে প্রকাশ করো না। তোমার রহমতের দরজায় আমাদের শুধু এই মিনতি, ওরা যেন আমাদের চিৎকার না শোনে।”
“মুসলমানের পা এগিয়ে চলে, পিছু হটেনা।”
ব্যক্তিগত মতামত
অতপর, সীমান্ত ঈগল আসলেই একটি সত্যিকার ইতিহাস ভিত্তিক এক অনন্য উপাখ্যান। পুরো বই জুড়ে কখনো রুদ্ধশ্বাস, কখনো হৃদয় ভাঙ্গা ব্যথার আবহ বিরাজমান। বইটি পড়া শেষ হয় কিন্তু হৃদয়ের গভীরে গেঁথে যায় কিছু বীর, দৃঢ় সাহসী, স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্ব। যারা ইসলামের জন্য, নিজের কওমের জন্য সর্বোচ্চ লুটিয়ে দিতে কুণ্ঠিত হয়নি।


