বুক রিভিউঃ আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধানে- ড. নাজীহ ইবরাহীম
ভূমিকা
আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধানে বইটি “মীসাকুল আমালিল ইসলামি” (ইসলামি কাজের রূপরেখা) গ্রন্থের অনুবাদ। এর লেখক তিনজন আলেম- ডক্টর নাজীহ ইবরাহীম, আসিম আবদুল মাজিদ এবং ইসামুদ্দীন দারবালাহ। ১৯৮৪ ঈসায়ি সনের ফেব্রুয়ারি মাসে এটি প্রকাশিত হয়। বইটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ডক্টর শাইখ উমার আব্দুর রহমান।বর্তমান যুগে ইসলামি সংস্কার কেমন হতে হবে, তার একটি পরিপূর্ণ রূপরেখা তুলে ধরেছেন লেখকগণ। আকীদা থেকে দাওয়াত, জিহাদ থেকে খিলাফা, তাকওয়া থেকে সবর—এই সবকিছু কীভাবে প্রতিটি মুসলিমের জীবনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে একসাথে কাজ করে, তা দেখানো হয়েছে। এখানে উঠে এসেছে আজকের মুসলমানদের সার্বিক অবস্থার একটি বাস্তব চিত্র।
“ইবনু তাইমিয়া কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, হকপন্থি আলেমদের কোথায় খোঁজে পাবো? তিনি উত্তরে বলেছিলেন- কারাগারে, যুদ্ধের ময়দানে, নয়তো মাটির নিচে।”
আল্লাহ্র সন্তুষ্টির সন্ধানে
“আল্লাহ যাকে পথ দেখান, তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে কেউ পথ দেখাতে পারে না।”
বইটির মূল উপাধ্য হচ্ছে, মানুষ যেন শরীয়তের মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তাদের জীবনযাত্রার সব ক্ষেত্রে উপস্থিত রাখে। আর মানুষ যেন সকল ব্যাপারে নিজেদেরকে শরীয়তের আহকামের প্রতি সমর্পণ করে।
“নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাহায্য করেন, যারা আল্লাহকে সাহায্য করে।”
আমরা যা ও যেভাবে বিশ্বাস করি
আমরা নিজেদের মুসলিম পরিচয় দেওয়া ই যথেষ্ট বলে মনে করি। অর্থাৎ সত্যনিষ্ঠ আলেমগণ ইসলাম কে যেভাবে বুঝেছিলেন, আমরা ও ঠিক সেভাবেই ইসলাম কে বুঝতে চাই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, “মুসলিম” বলতে আগে যা বুঝানো হতো, আজকের যুগে এই শব্দটি আর সেই একই অর্থ প্রকাশ করেনা। এর ভিন্ন ভিন্ন অর্থের প্রচলন ঘটেছে। একজন মুসলিমের ইসলাম সম্পর্কে কতটুকু জানা উচিত, ইসলাম কিভাবে মান্য করা উচিত এসবের ধারণাই পালটে গেছে। বর্তমানে সমাজতান্ত্রিক মুসলিম, উদারপন্থি মুসলিম, প্রগতিশীল মুসলিম, সেক্যুলার মুসলিম নামে নতুন নতুন মুসলিম আবিষ্কার হচ্ছে। হুদুদ, হিসবাহ, বা জিহাদের মতো ইসলামের অনেক মৌলিক বিষয় ই এরা সহ্য করতে পারে না। তারপরেও আমরা নিজেদের পরিচয় দেয় মুসলিম হিসেবে।
ইমাম শাফিঈ বলেছেন, “মানুষ যদি কেবল সূরা আল- আসর অধ্যয়ন করতো তা হলে এটাই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো।” এই সূরা তে বলা হয়েছে, “আল- আসর (সময়) এর শপথ! নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে। শুধু তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, একে অপরকে সত্যের উপদেশ দেয় আর ধৈর্যের উপদেশ দেয়।”
ব্যাপকতা, পূর্ণতা, মর্যাদা,পূর্ণাঙ্গতা, প্রজ্ঞা, ন্যায়বিচার, সূক্ষ্মতা, সহজতা ও ব্যবহারিক প্রয়োগযোগ্যতার দিক দিয়ে ইসলামের চেয়ে উত্তম কোন বিধান না কখনো মানবজাতি জানতো, বা আর কখনো জানবে। আর এটাই বাস্তবতা। ইসলাম আমাদের জীবনের সর্বব্যাপী। এ হল কলম- তরবারি, ইলম- আমল, আকিদা- শরিয়াহ, নীতি ও রাজনীতি, কাজ ও প্রতিদান, দুনিয়া ও আখিরাত।
আবু নাজিহ ইরবাজ (রাঃ) বলেন, “একবার আল্লাহ্র রাসুল (সঃ) এমন খুতবা দিলেন যে আমাদের অন্তর ভীত হয়ে গেলো, চোখ অশ্রুসজল হয়ে গেলো। তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহ্র রাসুল! মনে হচ্ছে যেন এটি শেষ খুতবা। তাই আমাদের কিছু উপদেশ দিয়ে যান। তখন রাসুল (সঃ) বললেন, আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি আল্লাহকে ভয় করার এবং কোন দাস ও যদি তোমাদের নেতা হয় তাহলে তার অনুসরণ করার। নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে যারা দীর্ঘদিন বাঁচবে, তারা প্রচুর মতবিরোধ দেখতে পারবে। অতএব, তোমরা অবশ্যই আমার সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুনাহ আঁকড়ে ধরে থাকবে। দ্বীনের মধ্যে নতুন উদ্ভাবিত বিষয় থেকে সাবধান। কারণ প্রতিটি নতুন বিষয় ই বিদআত, প্রতিটি বিদআতই পথভ্রষ্টতা এবং প্রতিটি পথভ্রষ্টতাই জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।”
আমাদের পথ ও পাথেয়
ইসলাম একটি ব্যাপক বিস্তৃত জীবনব্যবস্থা। এর কর্মপদ্ধতির মধ্যেও তাই বৈচিত্র্য রয়েছে। পৃথিবীতে পূর্ণাঙ্ঘ ইসলামি পরিবর্তন আনার জন্য বেশ কয়েকটি মাধ্যম ধাপে ধাপে ব্যবহৃত হয়। যাকে ইসলামে মানুষের চলার পথ হিসেবেও অভিহিত করা হয়। আর এই চলার পথগুলোর মধ্যে রয়েছে- দাওয়াত, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ, এবং জামাতের অধিনে থেকে আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদ করা। এই জামাতের কাজকর্ম পরিচালিত হবে ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী।এটি কাফিরদের মন রক্ষা করার জন্য তাদের সাথে কোন সমঝোতায় যাবে না এবং অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে।
আল্লাহ তার রাসুল কে দাওয়াতের নির্দেশ দিয়ে বলেন, “কাজেই তোমাকে যে বিষয়ের আদেশ করা হয়েছে তা জোরেশোরে প্রচার করো। আর মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও।”
অন্যদিকে পাথেয়’র মধ্যে আছে- তাকওয়া ও ইলম, ইয়াকিন ও তাওয়াক্কুল, শোকর ও সবর, এবং দুনিয়ার উপর আখিরাতের প্রাধান্য।
পথিকমাত্রই পাথেয়’র মুখাপেক্ষী। পথ যত লম্বা হয়, পাথেয় ততো বেশি লাগে। আর এই যাত্রার শেষে আছে জান্নাত নয়তো জাহান্নাম। আর মানুষের যাত্রা শুরু হয় পৃথিবীর নানা পরীক্ষার ভেতর দিয়ে, মাঝে থাকে কবরের মাটি, আর শেষ হয় রব্ব এর হাতে গিয়ে। আর এই পথযাত্রীকে সাহায্য করতে পারে ষে রকম কোন পাথেয় আদৌ নেই। সম্পদ, সন্তান, মর্যাদা ও ক্ষমতা এসব দুনিয়াবি রসদ আখিরাতে তার থোড়াই কাজে আসবে।
নবীজি (সঃ) বলেন, “তিনটি জিনিস মৃতের সাথে সাথে কবরস্থান পর্যন্ত যায়। এদের মাঝে দুটি ফিরে আসে, আরেকটি তার সাথে রয়ে যায়। অর্থাৎ পরিবার, সম্পদ ও আমল মৃতের সাথে করে যায়। তারপর পরিবার ও সম্পদ ফিরে আসে আর তার আমল তার সাথে থেকে যায়।”
আমাদের সংঘবদ্ধতা
মুসলমান কেবল একত্রিত হবে একটি মাত্র লক্ষ্য নিয়ে, একই আকিদার ভিত্তিতে এবং একই বুদ্ধিবৃত্তিক স্থলে। শরীয়ত যেমন আমাদের দলবদ্ধ হয়ে কাজ করার নির্দেশ দেয়, তেমনি কাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে আর কাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়া যাবে না এই বিষয়ে ও নির্দেশ দেয়। আমাদের মধ্যম্পন্থা অবলম্বন করতে হবে, কোন চরমপন্থার দিকে যাওয়া যাবে না। এলোপাথাড়ি সবার সাথে হাত মেলালেই হবে না। আবার এক্টু থেকে এক্টু ভুলের কারণেই কারো সাথে হাত মেলানো ত্যাগ করা যাবে না। অতি গ্রহণশীলতাও ঠিক নয়, অতি বর্জনশীলতাও ঠিক নয়। কোনটি গ্রহণ করতে হবে আর কোনটি বর্জন করতে হবে তা ঠিকঠাক ভাবে বুঝে নেওয়া আমাদের কর্তব্য।
“আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের ওপর বাধ্যতামূলক করেছেন যে তারা তার কিতাব দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবে এবং নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিলে এরই শরণাপন্ন হবে। তিনি আরও আদেশ দিয়েছেন বিশ্বাস ও কাজে কোরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে থাকার জন্য। এর ফলে ঐক্য বজায় থাকবে, অনৈক্য দূর হবে, দ্বীন ও দুনিয়ায় লাভবান হওয়া যাবে।”
ব্যক্তিগত মতামত
ভালো কাজের চর্চার বিকল্প নেই। চর্চায় থাকলে সব ঠিক থাকে অন্যথায় সবকিছুতেই ঘুণে ধরে। আর এই চর্চা টাকে এগিয়ে নেওয়া বা ধরে রাখার জন্য প্রত্যকের একটা রোডম্যাপ থাকা বাঞ্ছনীয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধানে বইটি আমার কাছে এমন একটি রোডম্যাপ ই মনে হয়েছে যেটার মাধ্যমে যে কারোরই সহজে পথচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।


