বুক রিভিউঃ ইন্দুবালা ভাতের হোটেল, কল্লোল লাহিড়ী
“এই পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছেন যাঁরা চিরকালের জন্য একা হয়ে যান। তখন তাঁরা সেই একাই একটা জগতের মধ্যে বাঁচতে ভালোবাসেন।”
আট অধ্যায় বিশিষ্ট বইটির কাহিনী আবর্তিত হয় খুলনার কলাপোতা গ্রামের মেয়ে ইন্দুবালাকে ঘিরে। দেশ স্বাধীনেরও আগে যার বিয়ে হয় কোলকাতায় এক বিপত্নীক মাতাল পুরুষের সাথে। মাতাল স্বামীর মৃত্যুর পর ছোট ছোট তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে ইন্দুবালা যখন দিশেহারা ঠিক তখনি বিহারী মাছওয়ালী লছমী’র অনুপ্রেরণায় ইন্দুবালা শুরু করেন ভাতের হোটেলের ব্যবসা। এরপর আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি ইন্দুবালাকে। এরই মধ্যে ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবুও থেমে যায়নি ইন্দুবালা ভাতের হোটেলের হেঁশেল। সত্তর পেরোনো ইন্দুবালাও কখনো কোন ধরনের সাহায্যের জন্য দারস্থ হননি ছেলেমেয়েদের কাছে।
“বোঝাকে বেশিক্ষণ মানুষ ঘাড়ের উপর চাপিয়ে রাখতে পারে না। মনে হয় কতক্ষণে নামাবে সে মাটিতে। আমি কারও বোঝা হতে চাই না রে।”
বইয়ের আটটি অধ্যায়ের নামকরণও করা হয়েছে আট পদের খাবারের উপর ভিত্তি করে। যেমন প্রথম অধ্যায়ের নাম- কুমড়ো ফুলের বড়া, দ্বিতীয় অধ্যায়ের নাম- বিউলির ডাল, আর তৃতীয় অধ্যায়ের নাম- ছ্যাঁচড়া এভাবেই একের পর এক অধ্যায় এগিয়ে গেছে। তবে এটা শুধুই নিছকই নামকরণ নয়। প্রতিটি খাবারের নামের সাথে সাথেই এগিয়েছে সেই খাবারের সাথে ইন্দুবালার স্মৃতি তথা তার জীবন কাহিনী।
“এত পুরনো এক জাব্দা খাতা এতদিনে শেষ হয়ে যাবারই কথা ছিল, কিন্তু হয়নি। তার কারণ বছর বছর ইন্দুবালা সেই খাতার সঙ্গে আবার পাতা জোড়েন। স্মৃতির বিসর্জন মানে নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়া।”
ইন্দুবালার জীবনের কাহিনী বইটিতে উঠে এসেছে বর্তমান এবং অতীতের সংমিশ্রণে। বিয়ের পরপরই কোলকাতায় চলে আসার পর খুলনায় আর আসা হয়নি তার। বাবার মৃত্যুর সময়ও যেতে পারেনি। এদিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধের সময় মিলিটারিরা মেরে ফেলে তার মা এবং মুক্তিযোদ্ধা ভাইকে। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় পুরো কলাপোতা গ্রামকে। এরপরে আর কখনো স্বাধীন বাংলাদেশে আসার আগ্রহ বোধ করেননি ইন্দুবালা।
“এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া মানুষদের ভিড় বাড়ে। পাসপোর্টে ছাপ পড়ে। বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে ইমিগ্রেশন পার করে মানুষ। এক সময়ে যে দেশটা নিজের দেশ ছিল সেটারই বেড়া টপকায়। প্রত্যেক বছর বৃষ্টি আসে নিয়ম করে দু'দেশেই। তবুও সীমান্তের দাগ মুছে যায়না সেই জলে। ওটা ইন্দুবালার দাদুর স্বপ্ন হয়েই থেকে যায়।”
জীবনের সিংহভাগ সময় কোলকাতাতে কাটলেও ইন্দুবালা ভাতের হোটেল চালু হওয়ার পর থেকেই সেখানের হেঁশেলে সেই খুলনার কলাপোতা গ্রামের ছোঁয়া ছিল। কৈশোরে ঠাম্মির কাছ থেকে শেখা রান্নাগুলোই ঘুরে ফিরে কোলকাতার উনুনে নতুন করে প্রান পায়। লেখক বেশ মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন খাবারগুলোর বর্ণনায়। কুমড়ো ফুলের মিঠে বড়া পোস্ত ছড়িয়ে, রান্নায় ঝালের জন্য চুইঝালের ব্যবহার, কালো জিরের ফোঁড়নে পার্শে মাছের ঝোল, ইলিশের মাথা ও পুঁইশাকের ছ্যাঁচড়া, সর ভাজা, কাসুন্দি দিয়ে কলমিশাক, কচু বাটা, চিংড়ির হলুদ গালা ঝোল, আম তেল আর মালপোয়ার মত খাবারের বর্ণনা এত সুনিপুণ ভাবে করেছেন যে বইটি পড়তে পড়তেই খিদে লেগে যেতে বাধ্য।
“প্রাচীন এক শিলায় নারকেল বাটা আর যন্ত্রে বাটার মধ্যে অনেক তফাত থাকে। পাথরের ওই স্বাদটা কি তিনটে স্টেনলেস স্টিলের ব্লেড দিতে পারে?”
বইটিতে যুগ যুগ ধরে আমাদের সমাজের নারীরা যে কি ধরণের একটা হাহাকার জীবন যাপন করে তা সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। তাছাড়াও দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ, নকশী কাঁথার মাঠ, বিষাদসিন্ধু আর মৈত্রী রেল কোনো কিছুই বাদ যায়নি ইন্দুবালার জীবন সংগ্রামের দোলাচলে। এককথায় একজন অতি অভিমানী নারীর জীবনের গোপন সুখ-দুঃখের সাথী এই ইন্দুবালা ভাতের হোটেল। সবশেষে বলবো বইটি পড়ে অনেক ভালো লেগেছে।



ভালো লেগেছে। পূর্বের রিভিউগুলো চাইতে আলাদা লাগ্ল পড়তে।