বুক রিভিউঃ মেডিটেশনস, মার্কাস অরেলিয়াস
সম্প্রতি মেডিটেশনস বইটি পড়ে শেষ করেছি। আর বইটি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে আমি যেন প্রাচীন রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের মানসিক জগতে প্রবেশ করেছি। এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরি, যেখানে তিনি নিজের জন্য জীবন, দায়িত্ব এবং নৈতিকতার উপর দার্শনিক চিন্তাগুলো লিখেছিলেন।
“প্রতিদিন যখন সকালে ঘুম থেকে ওঠো তখন তুমি ভাববে যে, জীবিত থাকা, চিন্তা করার শক্তি অব্যাহত থাকা, ভালো-মন্দ উপভোগ করতে পারা, এবং ভালোবাসার মতো একটি সুযোগ পাওয়া কী বিশাল সৌভাগ্য।” - এটি জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ জাগ্রত করতে সাহায্য করবে।
এই বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি ছিল এর আন্তরিকতা। মার্কাস এখানে অন্যদের জন্য লিখেননি, বরং নিজের জন্য লিখেছেন। এটি পড়ার সময় আমার মনে হয়েছিল, আমি যেন তাঁর পাশে বসে তাঁর গভীরতম ভাবনাগুলো শুনছি। কারণ তাঁর প্রতিটা কথা ই সময়-পরিসীমা অতিক্রম করে যেন বর্তমান জীবনেও প্রাসঙ্গিক।
“যা সঠিক নয়, তা করো না, যা সত্য নয়, তা বলো না।” - সততা ও নৈতিকতার একটি সরল অথচ গভীর নীতি।
মূল বইটির ভেতর ছোট ছোট বারোটি বই নিয়েই মেডিটেশনস তৈরি।বইটির কিছু অংশ যেমন আমাকে প্রেরণা জুগিয়েছে, তেমনি আবার কিছু অংশ আমাকে জীবনের অনিত্যতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে শিখিয়েছে।
“সময় নষ্ট করো না যে, একজন ভালো মানুষ কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে তর্ক করতে। বরং নিজেই একজন ভালো মানুষ হও।” - এখানে তিনি সরাসরি কর্মের আহ্বান জানিয়েছেন, তত্ত্ব নয়, বাস্তবতায় ভালো মানুষ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে।
এই বই থেকে যে উদ্ধৃতিটি আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে তা হলো- “তোমার মন, তোমার ইচ্ছা, তোমার ভালোমন্দ সবকিছুই তোমার নিজের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়, বাইরের ঘটনা দ্বারা না। এটা যত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবে ততো তাড়াতাড়ি নিজের জন্য শক্তি খুঁজে বের করতে পারবে।” কেননা, বাইরের পরিস্থিতি নয়, বরং নিজের চিন্তা ও প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করাই আসল ক্ষমতা। আমি প্রায়ই বাইরের পরিস্থিতি নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা করি যেগুলো আসলে কোনভাবেই আমার কন্ট্রোলে নেই। কিন্তু এই কথাগুলো আমাকে শেখালো, নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটাই আসল শক্তি।
সব মিলিয়ে, মেডিটেশনস আমাকে স্টোইক দর্শনের প্রতি গভীর মুগ্ধতা ও জীবনকে নতুনভাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। এটি এমন একটি বই, যা একবার পড়ে রেখে দেওয়া যায় না। বরং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ফিরে ফিরে পড়ার মতো একটি ম্যানুয়াল।
“তোমার জীবনের সুখ তোমার চিন্তার মানের উপর নির্ভর করে।” - ইতিবাচক ও যুক্তিসম্মত চিন্তাভাবনার মূলে রয়েছে আমাদের সুখ।
মেডিটেশনস বই পড়ে যে লেসন্সগুলো নিয়েছি তা নিচে তুলে ধরেছি-
জীবনে যারা আমাদের চরিত্র গঠনে সাহায্য করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। মার্কাস তাঁর পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের কাছ থেকে যে শিক্ষাগুলো শিখেছেন, সেগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন, যা আমাদেরও জীবনে প্রয়োগ করা উচিত।
বর্তমান মুহূর্তে বাঁচা এবং জীবনের অস্থিরতাকে মেনে নেওয়া। মার্কাস এর মতে, জীবনের একমাত্র সত্যিকার মুহূর্ত হচ্ছে এখন (বর্তমান), তাই অতীত বা ভবিষ্যতের চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে বর্তমানে মনোনিবেশ করা।
সরলতা ও আন্তরিকতার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করা। আমার কাজটি আমাকেই ভালোভাবে করতে হবে, তবে তার জন্য কখনো প্রশংসা বা পুরস্কারের আশায় থাকা যাবেনা।
সবকিছুই পরিবর্তনশীল, এবং পরিবর্তন একটি প্রাকৃতিক নিয়ম। তাই জীবনের অস্থিরতা ও মৃত্যুকে একটি প্রাকৃতিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখা উচিত।
কোনো ধরণের অজুহাত ছাড়াই আমাদের কাজ শুরু করতে হবে। আমাদের উদ্দেশ্য স্থির করে, একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যেতে হবে, ঠিক মার্কাস এর মতো করে।
আমরা প্রত্যেক মানুষ ই একে অপরের সাথে সম্পর্কিত, তাই আমাদের মাঝে সহযোগিতা ও সহানুভূতির সম্পর্ক থাকতে হবে। আমাদের সকলকে একত্রিতভাবে প্রকৃতির জন্য কাজ করতে হবে।
আমাদের শান্তি আমাদের মনেই থাকতে হবে। বাইরের পরিবেশ বা পরিস্থিতি আমাদের শান্তি নষ্ট করতে পারে না, যদি আমরা নিজের ভিতরের শান্তি বজায় রাখতে পারি।
আমাদের মন আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি, এবং আমাদের তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অন্য কিছু নয়। কারণ আমাদের চিন্তা ও মনোভাবই আমাদের জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে।
কাউকে দোষারোপ বা ক্রুদ্ধ হওয়া অনর্থক। আমরা যখন অন্যদের ভুল বুঝি, তখন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিস্থিতি বুঝতে চেষ্টা করতে হবে।
মৃত্যুকে স্মরণ করতে হবে এবং এর অস্থিরতায় জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে নিতে হবে। মৃত্যু জীবনের একটি অনিবার্য অংশ, এটি আমাদের অভ্যস্ত হতে সাহায্য করবে।
আমাদের জীবনে সরলতা বজায় রাখা ও দুঃচিন্তা কমানোর চেষ্টা করা উচিত, যাতে আমরা অপ্রয়োজনীয় চিন্তা ও কাজ থেকে মুক্ত থাকতে পারি। জীবনকে সহজ ও সরল রাখলে শান্তি পাওয়া যায়।
আমরা একটি বৃহত্তর মহাবিশ্বের অংশ, এবং আমাদের নিজেদের ছোট্ট দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক বড় ছবি দেখতে হবে। আমাদের অহংকার পরিহার করতে হবে ও একেকজন প্রকৃতির একেকটা অংশ হিসেবে নিজেদের জীবন কাটাতে হবে।
ব্যক্তিগত মতামত
লেখার ধরণ শেক্সপিয়রিয়ান স্টাইলের হওয়াতে বইয়ের ভাষা কখনো কখনো ভারী মনে হতে পারে নতুন রিডারদের কাছে যার ফলে পড়ার গতি কিছুটা কমে যেতে পারে। তবে তা ধীরে ধীরে, গভীরভাবে পড়তে উৎসাহিত করবে। আমার কাছে প্রতিটি অনুচ্ছেদই একটি ধ্যানের মতো ছিল, যা বইটির শিরোনামের সার্থকতা প্রমাণ করেছে।
যদি এমন একটি বই পড়তে চান, যা আপনাকে জীবনের অর্থ খুঁজতে সাহায্য করবে এবং মানসিক শান্তি পেতে প্রেরণা দেবে, তবে আমি মেডিটেশনস পড়ার পরামর্শ দিবো। এটি আমাকে চ্যালেঞ্জ করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে সর্বোপরি জীবন সম্পর্কে আরো বেশি কম্প্যাশনেট হতে সাহায্য করেছে।


