আমি কি যথেষ্ট?ঃ বিকামিং, মিশেল ওবামা
একটি গাছ যখন মাটি ভেদ করে প্রথমবার মাথা তোলে, সে জানে না তার শিকড় কতোটা গভীরে যাবে। সে শুধু জানে আলোর দিকে তাকে যেতে হবে। মিশেল ওবামার Becoming পড়তে পড়তে বারবার এই ছবিটাই মনে এসেছে। একটি মেয়ে শিকাগোর সাউথ সাইডের ছোট্ট একটি অ্যাপার্টমেন্টে জন্মেছে। যে জানত না সে একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী বাড়ির দরজা দিয়ে হেঁটে ঢুকবে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা সে জানত না যে সেই যাত্রায় নিজেকে বারবার হারিয়ে আবার পুনরুদ্ধার করাটাই হবে তার আসল গল্প।
বইটি শুধু একটি স্মৃতিকথা না। একটি স্বীকারোক্তি- সময়ের কাছে, নিজের কাছে, এবং পৃথিবীর সেই লক্ষ কোটি মানুষের কাছে যারা প্রতিদিন সকালে উঠে ভাবে, “আমি কি যথেষ্ট?” “আমি কি পারবো?”
শিকড়ের কথা
মিশেল রবিনসনের শৈশব পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে যেন কেউ একটা পুরনো অ্যালবাম খুলে দিলো। ছবিগুলো ঝাপসা কিন্তু আবেগ একদম জীবন্ত। বাবা ফ্রেজার রবিনসন মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়া একজন মানুষ। যিনি প্রতিদিন সকালে বোতামে আঙুল রাখতে কষ্ট হলেও অফিসে যেতেন। সময়মতো। হাসিমুখে। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন দায়িত্ব থেকে পালানো যায় না, শুধু মাথা উঁচু রেখে বহন করা যায়।
এই বাবার ছায়া Becoming-এর প্রতিটি পাতায় পড়েছে। মিশেল লেখেন বাবার ওয়াটার হিটারের পাইপ দিয়ে শোনা বেসমেন্টের সেই সকালগুলো তার কাছে শৈশবের সবচেয়ে নিরাপদ শব্দ। তার মানে ছিল বাবা এখনো আছেন।
আমরা যখন বড় হই তখন বুঝি না যে ছোট ছোট উপস্থিতিগুলোই আসলে আমাদের মেরুদণ্ড তৈরি করে। একসাথে খাওয়া, সন্ধ্যার গল্প, বাবার একটা কাশির শব্দ এগুলো মূলত স্মৃতি না বরং মাটি। যে মাটিতে আমাদের শিকড় বাড়ে।
যখন বলা হয়- তুমি পারবে না
প্রিন্সটনে ভর্তির আগে এক কাউন্সেলর মিশেলকে বলেছিল তুমি “প্রিন্সটন ম্যাটেরিয়াল” নও। এই একটি বাক্য। এই একটি মুহূর্ত। পুরো বইতে এটি হয়তো এক অনুচ্ছেদ মাত্র, কিন্তু পাঠক হিসেবে আমি সেখানে থমকে গেছি। কারণ মনে হয়েছে বাক্যটি শুধু মিশেলকে বলা হয়নি। এটি প্রতিটি সেই মানুষকে বলা হয়েছে যে কখনো কোন ঘরে ঢুকে অনুভব করেছে, “আমি এখানে মানাই না।” বা “ আমি এটার/এর যোগ্য না?”
এখানে বইটি একটি রূপকথার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায়। রূপকথায় নায়িকা জানে সে বিশেষ। Becoming-এর মিশেল জানেন না। তিনি সন্দেহ করেন। ভয় পান। নিজেকে প্রমাণ করার চেষ্টা করতে করতে ক্লান্ত হন। এটাই এই বইয়ের সততা এবং এই সততাই বইটিকে অসাধারণ করে তোলে।
একটি পাথর যখন নদীর স্রোতে পড়ে সে প্রথমে ডুবে যায়। তারপর হয় সে ভেসে ওঠে নাহয় তলায় স্থির হয়ে যায়। কিন্তু দুটো ক্ষেত্রেই নদী তাকে বদলে দেয়। মিশেলের জীবনেও তেমন কিছু স্রোত এসেছিল। সেই স্রোতগুলো তাকে ভেঙেছে ঠিকই কিন্তু শেষ পর্যন্ত মসৃণ করেছে।
বারাক- একটি প্রেমের গল্প কিন্তু শুধু প্রেমের না
মিশেল-বারাকের সম্পর্ক পড়তে গিয়ে মাঝে মাঝে হাসি পেয়েছে। মাঝে মাঝে বুকে একটু চাপ অনুভব হয়েছে। কারণ এটি হলিউডের প্রেমের মতো ছিলোনা। এখানে মতবিরোধ আছে, ক্লান্তি আছে, “তুমি কি সত্যিই আমাকে বোঝো?” আছে।
মিশেল লেখেন একটা সময়ের কথা যখন তিনি রাতে কাঁদতেন, একা। কারণ বারাক তখন রাজনীতির নেশায় ডুবে ছিল। তখন মিশেল অনুভব করছিলেন যে তাদের সংসারটি একটি নৌকার মতো। একদিকে তিনি বৈঠা মারছেন অন্যদিকে বারাক দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছেন।
থেরাপিতে যাওয়ার কথা স্বীকার করা একজন ফার্স্ট লেডির জন্য কতোটা সাহসের তা যদি আমরা একটু ভেবে দেখি তাহলে বুঝবো এই বইটি শুধু অনুপ্রেরণার গল্প না, একটি মানবিক দলিল ও বটে। যেখানে পরিপূর্ণতার ভান নেই। যেখানে “আমরা সুখী দম্পতি” বলে ছবি তোলা নেই। বরং আছে “আমরা চেষ্টা করছিলাম” বলার সৎ স্বীকারোক্তি আছে।
এই সততাই আমার মতো পাঠককে স্পর্শ করে। যেমন করে শীতের সকালে ঠান্ডা পানির স্পর্শ জাগিয়ে তোলে আমাদের শরীর মন উভয়কে।
হোয়াইট হাউস- সোনার খাঁচা?
যে অধ্যায়গুলোতে মিশেল হোয়াইট হাউসের জীবনের কথা বলেছেন, সেগুলো পড়তে গিয়ে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। বাইরে থেকে যা মনে হয় সোনার প্রাসাদ, ভেতর থেকে তার অনুভূতি অনেকটা ভিন্ন। যেমন একটি পাখি যে উড়তে ভালোবাসে, তাকে যদি একটি বড় খাঁচায় রাখা হয়, তাহলে সে বলবে না যে সে কষ্ট পাচ্ছে। কারণ খাঁচাটি বড় ও সুন্দর। কিন্তু উড়তে না পারার বেদনা তার বুকে জমতে থাকে ক্রমশ।
মিশেল লেখেন কীভাবে সাধারণ কাজ যেমন বাজারে যাওয়া বা মেয়েদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া এসব কিছু হয়ে যায় একটি নিরাপত্তা’র মহড়া। কীভাবে গোপনীয়তা বলে কিছু থাকে না। কীভাবে প্রতিটি কথা, প্রতিটি পোশাক, প্রতিটি অভিব্যক্তি হয়ে ওঠে জাতীয় বিতর্কের বিষয়।
সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী যে অংশটি আমার কাছে লেগেছে যখন উনার দুই মেয়ে মালিয়া আর সাশার কথা লিখেছেন। মা হিসেবে মিশেলের উদ্বেগ পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, ক্ষমতা আর মাতৃত্ব একই সাথে বহন করা কতো ভারী একটি বোঝা। একদিকে পৃথিবী তাকে দেখছে একটি প্রতীক হিসেবে, অন্যদিকে দুটো মেয়ে তাকে চাইছে শুধু মা হিসেবে।
“Am I good enough?”- এই প্রশ্নটি
পুরো বইয়ে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে- “আমি কি যথেষ্ট ভালো?” তবে এই প্রশ্নটি মিশেলের একার না। এটি একটি কালো মেয়ের প্রশ্ন যে সাদাদের ঘরে পড়তে গেছে। একটি কর্মজীবী মায়ের প্রশ্ন যে ভাবছে সে কি সন্তানকে যথেষ্ট সময় দিচ্ছে। একটি স্ত্রীর প্রশ্ন যে নিজের স্বপ্ন রেখে স্বামীর স্বপ্নের পাশে দাঁড়িয়েছে।
আর এই প্রশ্নের মধ্যেই পুরো মানব সভ্যতার এক ক্লান্তি আছে।
মিশেল এই প্রশ্নের কোনো মসৃণ উত্তর দেননি। তিনি বলেননি “হ্যাঁ, তুমি যথেষ্ট ভালো।” তিনি বলেছেন- প্রশ্নটা করতে থাকো, কিন্তু প্রশ্নটাকে তোমাকে থামাতে দিও না। এটুকুই। এটুকুই যথেষ্ট।
একটি মোমবাতি জানে না সে কতটুকু আলো দিচ্ছে। সে শুধু জ্বলে। মিশেলের পুরো জীবন এই মোমবাতির মতো। নিজের উজ্জ্বলতা সম্পর্কে নিশ্চিত না, কিন্তু নিভে যেতে অস্বীকার করেছে বারবার।
হয়ে ওঠার যাত্রা শেষ হয় না
Becoming শেষ হয় কিন্তু শেষ হয় না। মিশেল নিজেই বলেন- এটি কোন সমাপ্তির গল্প না। “Becoming” মানে হয়ে যাওয়া বা উদ্ভব না, হয়ে ওঠা’র/ উদ্ভবের পথে থাকা। এটি একটি ক্রিয়াপদ, বিশেষ্য না। বইটি শেষ করার পর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম নিজে। জানালার বাইরে তাকিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলাম, আমিও কি হয়ে উঠছি? নাকি থেমে আছি?
আমার মনে হয় এই প্রশ্নটা করানোর ক্ষমতা যে বইয়ের আছে সে বই শুধু একটি ব্যক্তির স্মৃতিকথা না। সে বই একটি আয়না। যেখানে নিজের মুখ দেখা যায়, ভালো করে। যেমন কেউ চায় না দেখতে, কিন্তু দেখলে ভালো লাগে।
মিশেল ওবামা সেই আয়নাটা তুলে ধরেছেন। বাকিটা আমাদের।


