নিয়ন্ত্রণের মায়া ভাঙার বইঃ মেল রবিন্সের দ্য লেট দেম থিওরি
আমরা জন্ম থেকেই একটি অদৃশ্য ভুল ধারণার মধ্যে দিয়ে বড় হই। মনে করি, ভালোবাসা যদি যথেষ্ট গভীর হয় তাহলে সে মানুষটি যেমনই হোক বদলে যাবে। যত্নে যদি যথেষ্ট আন্তরিকতা থাকে তবে সম্পর্ক অবশ্যই টিকে থাকবে। যুক্তি যদি যথেষ্ট স্ট্রং হয় তবে ভুল বোঝাবুঝি একদিন ঠিকই মুছে যাবে। অথচ জীবন ধীরে ধীরে আমাদের এক নির্মম সত্যের সামনে দাঁড় করায়। সেটা হল মানুষকে ভালোবাসা যায় ঠিকই কিন্তু তাকে নিজের ইচ্ছামতো গড়ে তোলা যায় না। কারো পাশে থাকা যায় ঠিকই কিন্তু তার সিদ্ধান্ত নিজের হাতে নেওয়া যায় না। আর সবচেয়ে বিটার ট্রুথ আমরা যার বা যাদের জন্য সর্বোচ্চ হায়াত কামনা করি অনেক সময় তাকে/তাদেরই হারিয়ে ফেলতে হয়।
আমাদের জীবনের অধিকাংশ অশান্তি হয়তো উপরোক্ত ঘটনাগুলো থেকে আসে না, আসে সেই ঘটনাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যর্থ চেষ্টা থেকে। আমরা চাই সবাই আমাদের পছন্দ করুক। আমরা চাই কেউ আমাদের ভুল না বুঝুক। আমরা চাই সম্পর্কগুলো আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলুক। আমার কাছের মানুষজন লম্বা হায়াত নিয়ে পৃথিবীতে থাকুক ইত্যাদি। কিন্তু পৃথিবী কখনোই আমাদের প্রত্যাশার অনুগত ছিল না, থাকবেনা। এখানেই The Let Them Theory একটা আত্মবিপ্লবী ধারণা হিসেবে আসলেও তা অত্যন্ত সহজ ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। The Let Them Theory’র কেন্দ্রীয় আলোচনায় আছে মাত্র দুটি শব্দঃ “Let Them.”
প্রথম পড়ায় বাক্যটি অনেকখানি উদাসীনতার মতো শোনায়। যেন লেখক বলছেন কোনকিছুকেই অতো বেশি গুরুত্ব দিও না। মানুষ যা খুশি করুক। কিন্তু বইটি পড়তে পড়তে যতো ভেতরে যাই ততোই বুঝতে পারি যে, এই দুটি শব্দ আসলে উদাসীনতার না, বরং স্বাধীনতার ভাষা। অন্যকে ছেড়ে দেওয়ার ভাষা না, নিজের ভেতরের শৃঙ্খল/ মিথ্যা বন্ধন খুলে ফেলার ভাষা।
মার্কাস অরেলিয়াস তার Meditations-এ লিখেছিলেন, “You have power over your mind, not outside events.” প্রায় দুই হাজার বছর পরে Mel Robbins সেই একই সত্যকে আধুনিক জীবনের সম্পর্ক, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যক্তিগত অনিশ্চয়তার ভেতর নতুন ভাষায় নতুন করে তুলে ধরেছেন। তাই বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এটা কোনো নতুন দর্শন আবিষ্কার করেনি বরং বহু পুরোনো একটুকরো জ্ঞানকে এমনভাবে পুনরুদ্ধার করছে যা আজকাল আমাদের জন্য অনেক জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আধুনিক পৃথিবী আমাদের এক অদ্ভুত বিভ্রমে অভ্যস্ত করেছে। আমরা মনে করি যদি সবকিছু যথেষ্ট ক্লিয়ার করে চলি আশেপাশের মানুষ আমাদের বুঝবে। যদি সম্মান পাবার যথেষ্ট চেষ্টা করা হয় সবাই আমাদের মূল্য দেবে। যদি সবকিছু নিখুঁত ভাবে করা যায় তবে রিজেকশনের কোনো কারণ থাকবে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মানুষ আমাদের নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে না, তাদের অভিজ্ঞতার আলোতেই দেখে। তাদের ভালোবাসা, তাদের ভয়, তাদের সীমাবদ্ধতা এবং তাদের অপূর্ণতাই নির্ধারণ করে তারা আমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করবে।
এই উপলব্ধিই The Let Them Theory- এর প্রথম এবং বড় শিক্ষা।
কেউ যদি আপনার মেসেজের উত্তর না দেয়, let them।
কেউ যদি আপনাকে ভুল বোঝে, let them।
কেউ যদি আপনার মূল্য বুঝতে না পারে, let them।
কথাগুলো প্রথমে নিষ্ঠুর শোনাতে পারে। কারণ আমাদের সংস্কৃতি বরাবরই শিখিয়েছে সম্পর্ক বাঁচাতে হলে ডাবল চেষ্টা করতে হয়। অনেক করে বোঝাতে হয়। অনেক বেশি সহ্য করতে হয়। কিন্তু মেল এখানে একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন করেনঃ যদি আপনার সমস্ত শক্তি কেবল অন্যের সিদ্ধান্ত বদলানোর পেছনেই ব্যয় হয় তবে নিজের জীবন বাঁচানোর শক্তি কোথায় থাকবে?
এখানেই বইটির সবচেয়ে গভীর বার্তা টা আসে। “Let Them” কখনোই শেষ কথা না। বরং এর পরেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, “Let Me.”
মূলত এই দুটি শব্দের মধ্যেই পুরো বইটির হৃদস্পন্দন লুকিয়ে আছে।
“Let Them” অন্যের স্বাধীনতাকে স্বীকার করে।
“Let Me” নিজের স্বাধীনতাকে পুনরুদ্ধার করে।
কেউ যদি আপনাকে ছেড়ে যেতে চায় তাহলে তাকে যেতে দিন। তারপর নিজেকে অনুমতি দিন এমন একটি জীবন গড়তে যেখানে আপনার মর্যাদা অন্যের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করবে না। কেউ যদি আপনার সাফল্যে আনন্দিত না হয় তাহলে তাকে সেই স্বাধীনতা দিন। তারপর নিজেকে অনুমতি দিন যে নিজের আনন্দকে অন্যের স্বীকৃতি/ এপ্রিসিয়েশন থেকে আলাদা করতে।
এই ছোট্ট পরিবর্তনটি ভাষাগত না, অস্তিত্বগত। কারণ মানুষ যখন “কেন সে এমন করল?” প্রশ্ন থেকে সরে এসে “এখন আমি কী করব?” প্রশ্ন করতে শেখে তখন তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু বদলে যায়। সে আর অন্যের আচরণের উপগ্রহ হয়ে থাকে না। নিজের জীবনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
The Let Them Theory মূলত নিয়ন্ত্রণস্পৃহার মনোবিজ্ঞান নিয়ে লেখা একটি বই। আমরা প্রায়ই মনে করি আমাদের উদ্বেগের কারণ অনিশ্চয়তা। বাস্তবে উদ্বেগের বড় একটি অংশ জন্ম নেয় সেই জায়গা থেকে যেখানে আমরা অনিশ্চয়তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। আর মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে অনিশ্চিত কাজ পৃথিবীতে খুব কমই আছে।
আজকের পৃথিবীতে আমরা প্রায় সবাই অদৃশ্য এক মঞ্চে বাস করি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের প্রতিদিন শেখায় অন্যের চোখে নিজেদের মূল্য মাপতে। কে আমাদের পোস্টে রিয়েক্ট দিলো কে দিলো না। কে আমাদের দাওয়াত দিলো আর কে ভুলে গেলো। কে আমাদের ছাড়া ভালো আছে, আনন্দে আছে আর কে নেই। ধীরে ধীরে আমরা এমন এক জীবন গড়ে তুলি যেখানে নিজের অনুভূতির চালকের আসনে আমরা নই, অন্যরা বসে থাকে।
মেল এই অদৃশ্য নির্ভরশীলতার কথাই বলেন। তিনি লিখেছেন কেউ যদি আপনাকে পছন্দ না করে সেটা তার স্বাধীনতা। কিন্তু সেই অপছন্দকে নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেলা আপনার সিদ্ধান্ত। এই পার্থক্যটি সূক্ষ্ম হলেও জীবন বদলে দেওয়ার মতো শক্তিশালী। কারণ আমাদের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা হয়তো পছন্দের স্বাধীনতা না, বরং রিয়েকশন বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা।
এই জায়গায় বইটির সঙ্গে মনোবিজ্ঞানী ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কলের একটি বিখ্যাত ভাবনার মিল খুঁজে পাই। ফ্র্যাঙ্কল লিখেছিলেন, মানুষের কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নেওয়া সম্ভব কিন্তু একটি জিনিস কখনো কেড়ে নেওয়া যায় না। আর সেটা হল পরিস্থিতির প্রতি নিজের প্রতিক্রিয়া বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা। The Let Them Theory যেন সেই দর্শনকেই দৈনন্দিন জীবনের ভাষায় তুলে ধরেছেন
এই বইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো এটা রিজেকশনকে নতুন অর্থ দেয়।
আমরা সাধারণত রিজেকশন কে ব্যর্থতা মনে করি। কিন্তু মেল দেখান রিজেকশন অনেক সময় আমাদের দিকনির্দেশনা দেয়। যেমন যে মানুষটা আপনার পাশে থাকতে চায় না, সে হয়তো তা আপনাকে জানিয়ে আপনাকে আঘাত করছে না বরং আপনার জীবনে নিজের অনুপস্থিতির সত্যটুকু জানিয়ে দিচ্ছে। যে কর্মক্ষেত্র আপনাকে মূল্য দেয় না সেটি হয়তো আপনার অযোগ্যতার প্রমাণ করছে না বরং আপনার জন্য ভুল জায়গা হিসেবে প্রকাশ করছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি যদিও সহজ না। কারণ আমাদের মস্তিষ্ক স্বভাবতই রিজেকশন কে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে গ্রহণ করে। আমরা ভাবি, “আমার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো ত্রুটি আছে।” অথচ অনেক সময় সম্পর্ক ভেঙে যায় চরিত্রের অভাবে না, সামঞ্জস্যের অভাবে। সব মানুষ সব মানুষের জন্য না। এই সত্য মেনে নেওয়া মানে কারো পরাজয় না, বরং পরিণত হওয়ার লক্ষণ।
এখানে সীমারেখার (বাউন্ডারি) কথাও বলা হয়। তবে এই সীমারেখা কোন দেয়াল না। এটা এমন একটা দরজা যা বলে, “আমি তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করবো না কিন্তু তোমার আচরণ আমার জীবনে কতোখানি জায়গা পাবে সেই সিদ্ধান্ত আমি নেব।”
এই পার্থক্যটা অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা প্রায়ই সীমারেখাকে (বাউন্ডারিকে) শাস্তি মনে করি। বাস্তবে এটি আত্মসম্মানের একটি রূপ। যে মানুষ নিজের মানসিক সুস্থতার জন্য সীমা টানতে পারে না সে শেষ পর্যন্ত অন্যের আবেগের ভার বহন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
এখানেই মেল-এর “Let Me”” ধারণাটি আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
Let me leave the table where I am not respected.
Let me stop chasing people who have already stopped choosing me.
Let me build a life that does not depend on constant validation.
এই “Let Me” আসলে কোন আত্মকেন্দ্রিকতার ভাষা না। এটা অনেকটা আত্মদায়িত্বের ভাষা। কারণ স্বাধীনতা কখনোই কেবল বাইরের শৃঙ্খল/ নিয়ম ভাঙার মধ্যে সীমাবদ্ধ না। অনেক সময় নিজের পুরোনো অভ্যাস, অপ্রয়োজনীয় অপরাধবোধ এবং সবকিছুতেই অকারণ ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রবণতা থেকেও মুক্ত হওয়া লাগে।
আমার কাছে এই বইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন ভাষায় না, দৃষ্টিভঙ্গিতে।
কারণ এই বইটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে শেখায়। জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, “আমি কীভাবে মানুষটাকে বদলাব?” না। প্রশ্ন হওয়া উচিত, “যাকে আমি বদলাতে পারবোনা তার আচরণের উপর কেন আমার শান্তি নির্ভর করবে?”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আত্মমর্যাদাকে নতুনভাবে দেখতে শিখি। আত্মমর্যাদা মানে নিজের মূল্য বারবার অন্যের কাছে প্রমাণ করার চেষ্টা না। বরং আত্মবিশ্বাস এমন যা আপনাকে মনে করিয়ে দেয় যে সবাই আপনাকে বুঝবে না, সবাই আপনাকে ভালোবাসবে না, সবাই আপনার পাশে থাকবে না। আর তাতে আপনার মূল্য একটুও কমে যায় না। এই সত্যটি যদি আপনি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারেন তাহলে অন্যের এপ্রিসিয়েশন এর উপর নির্ভর না করেও নিজের জীবনকে সম্মান ও মূল্য দিতে শিখবেন।
যদি কখনো অন্যের প্রশংসার অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে পড়ে থাকেন, যদি কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গিয়ে নিজের ইচ্ছা আর কণ্ঠস্বর উভয়কেই হারিয়ে ফেলেন, যদি কোনো প্রত্যাখ্যানকে নিজের অযোগ্যতার প্রমাণ বলে মনে করে থাকেন, কিংবা বছরের পর বছর অন্যের আচরণের ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে নিজের জীবন আর স্বপ্নকে পিছিয়ে দিয়ে থাকেন তাহলে এই বইয়ের কথাগুলো আপনার ভেতরেও নিশ্চয়ই কোথাও গিয়ে ধাক্কা দেবে। আর বলবে কষ্ট পাও। কিন্তু কষ্টকে নিজের স্থায়ী ঠিকানা বানিও না।
হয়তো এ কারণেই বইটি পড়া শেষ হওয়ার পরও এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক্যটি বইয়ের পাতায় থাকে না। সেটি ধীরে ধীরে আমাদের প্রতিদিনের জীবনে প্রবেশ করতে শুরু করে।
কেউ কথা রাখল না?
Let them.
কেউ চলে গেল?
Let them.
কেউ আপনাকে ভুল বুঝল?
Let them.
তারপর?
Let me keep my dignity.
Let me choose peace over persuasion.
Let me build a life that is no longer held hostage by someone else’s choices.
সম্ভবত বইটির সবচেয়ে সুন্দর অবদান এখানেই। এটি আমাদের শেখায়, অন্যকে ছেড়ে দেওয়া মানে তাকে হারিয়ে ফেলা না বরং নিজের ভেতরের সেই মানুষটিকে ফিরে পাওয়া যে এতোদিন অন্যের অনুমোদনের অপেক্ষায় বসে ছিল।
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন অনেক সময় কোনো নতুন সম্পর্ক, নতুন শহর বা নতুন সাফল্য থেকে আসে না। আসে একটি ছোট্ট সিদ্ধান্ত থেকে। সেই সিদ্ধান্তটা হলো আমি আর আমার শান্তির চাবি অন্য কারও হাতে তুলে দেব না।
হয়তো পরিণত হওয়া মানে সব প্রশ্নের উত্তর জেনে যাওয়া না। হয়তো পরিণত হওয়া মানে এইটুকু বুঝতে শেখা যে, মানুষ তার নিজের মতোই থাকবে। পৃথিবীও আমাদের ইচ্ছামতো চলবে না। কিন্তু সেই অনিয়ন্ত্রিত পৃথিবীর মাঝেও আমরা কেমন মানুষ হয়ে উঠবো সেই সিদ্ধান্তটি এখনো আমাদের নিজের। আর সেই স্বাধীনতার নামই, সম্ভবত, The Let Them Theory।


