বুক রিভিউঃ ব্রিদা, পাওলো কোয়েলহু
ব্রিদা একজন তরুণ আইরিশ মেয়ে। বিশ বছর বয়স। সে আলোর খোঁজ করছে কিন্তু সে নিজেও জানে না ঠিক কোন আলো। সে একটা জাদুকরকে খুঁজে বের করে, পাহাড়ে তার কাছে যায়, বলে “আমাকে জাদু শেখাও।”
আর জাদুকর তাকে একা রেখে চলে যায় একটা অন্ধকার বনে। সারারাতের জন্য।
এটাই ব্রিদা’র প্রথম লেসন হয়ে উঠে। অর্থাৎ একা থাকার ভয়কে জয় করা।
পড়তে পড়তে আমি থমকে গেলাম এইখানে। কারণ আমি জানি এই ভয়টা। এটা শুধু বনের অন্ধকারের ভয় না। এটা নিজের ভেতরের অন্ধকারের ভয়। যেখানে কোনো কণ্ঠস্বর নেই, কোনো আশ্বাস নেই যে কোন কিছু হলেই কেউ দৌড়ে চলে আসবে সাহায্য করার জন্য। শুধু তুমি আর তোমার নিজের সঙ্গে তুমি।
কোয়েলো এই দৃশ্যটা এত সহজভাবে লিখেছেন যে মনেই হয় না এটা কোন গল্প। মনে হয় কেউ যেন সত্যিই এই রাতটার কথা বলছে।
দুটো পথ, একটাই গন্তব্য
বইয়ের মধ্যে দুটো চরিত্র আছে যারা ব্রিদাকে শেখায়- ম্যাগাস (জাদুকর) আর উইক্কা।
ম্যাগাস শেখায় সূর্যের ঐতিহ্য সম্পর্কে। নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলো, একাকীত্বকে আলিঙ্গন করো, ভয়ের মুখে দাঁড়াও।
উইক্কা শেখায় চাঁদের ঐতিহ্য সম্পর্কে। ডান্স করো, প্রতিটা সময় উদযাপন করো, জীবনের প্রতিটা মুহূর্তকে রহস্যময় করে দেখো।
আপাতদৃষ্টিতে এ বিভাজনটাকে পড়তে পড়তে মনে হয় শুধু আধ্যাত্মিকতার কথা। কিন্তু আসলেই বিষয়টা আধ্যাত্মিকতার কথা না শুধু। এটা আমাদের সকলের জীবনের কথা। আমরা কেউ কেউ কষ্ট পেয়ে শিখি। কেউ আনন্দ পেয়ে শিখি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পৌঁছানোর জায়গাটা একই- নিজেকে চেনা।
আমাদের স্কুল- কলেজ আমাদের কখনো এটা শেখায় না যে কোন পথ নিলে তুমি সার্থক হবে বা কোন পথ নিলে তুমি কম ব্যর্থ হবে। বা কোন পথটা তোমার এটা কেউ বলে না।
ব্রিদা নিজেকে খুঁজে পায় উইক্কার পথে। কিন্তু ম্যাগাসের কথাগুলো ব্রিদা’কে ছেড়ে যায় না।
বইয়ের একটা জায়গায় ব্রিদা উইক্কার কাছে জিজ্ঞেস করে যে কীভাবে বুঝবো আমি সঠিক পথে আছি? তখন উত্তরে উইক্কা বলেন যখন ঝুঁকি নেবে তখন বুঝবে। যখন ভুল করবে তখন বুঝবে। হারিয়ে যাবার পরেও যখন এগিয়ে যাবে তখন বুঝবে।
এই কথাগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়েছে আমরা সবাই কোনো না কোনো সময় ব্রিদা। আমরা সবাই কিছু একটা খুঁজছি যার নাম জানি না, ঠিকানা জানি না। শুধু জানি এখন যেখানে আছি সেখানে সম্পূর্ণ নই।
এই অসম্পূর্ণতার বোধটা মানুষকে হয়তো সবচেয়ে বেশি একা করে। কারণ এটা বলা যায় না। বললে মানুষ বোঝে না। বলে- কী চাও তুমি? কিসের অভাব? এতো লাক্সারি কিসের?
কিন্তু কোয়েলো বোঝেন। তাই তিনি লেখেন।
শেষে ব্রিদা একটা জায়গায় পৌঁছায়। সেখানে সে কাঁদে। কারণ সে বুঝতে পারে কিছু ভালোবাসা পাওয়া যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।
আমিও কেঁদেছিলাম।
শুধু ব্রিদার জন্য না। নিজের জন্যও।
কারণ কোথাও না কোথাও আমিও জানি কিছু মানুষ আছে যাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিল। হয়নি। হবে না। আর সেই না-হওয়াটা বহন করতে হয় নিঃশব্দে, একা।
তবে Brida সেই একাকীত্বকে একটু হালকা করে। বলে তুমি একা না। এই যাত্রা সবারই আছে। শুধু রাস্তাগুলো আলাদা।


