বুক রিভিউঃ দ্য সায়েন্স অফ গেটিং রিচ, ওয়ালেস ডি. ওয়াটলস
কিছু বই কেবল শেখায়, আর কিছু বই জাগিয়ে তোলে। The Science of Getting Rich ওয়ালেস ডি. ওয়াটলসের লেখা এই শতবর্ষ পুরোনো বইটি আমার কাছে পড়ার পর দ্বিতীয় ধারার বলে মনে হয়েছে। নাম শুনে ভেবেছিলাম হয়তো অর্থ উপার্জনের কৌশল নিয়ে একটি সাধারণ অনুপ্রেরণামূলক বই। কিন্তু পড়তে পড়তে বুঝলাম এটি আসলে জীবন, চিন্তা, আর আত্মার সৃজনশীল সম্ভাবনা নিয়ে একটি গভীর অধ্যাপনা। যেখানে চিন্তা ও বিশ্বাস মিলে গঠন করে এক নতুন বাস্তবতা।
ওয়াটলস ব্যবসায়িক ভাষায় লেখেন, কিন্তু তাঁর ভাবনার গভীরে গিয়ে স্পর্শ করে এক ধরনের আধ্যাত্মিক সুর। তিনি বলেন, “You must become creators, not competitors.” এই একটিমাত্র বাক্যেই আমি এক নীরব বিপ্লব অনুভব করি। তাঁর কাছে ‘ধনী হওয়া’ মানে কেবল সম্পদ অর্জন নয়, বরং সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে একাত্ম হওয়া। নিজেকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে মানুষের চিন্তা বাস্তবতাকে রূপ দিতে পারে। কারণ প্রতিযোগিতা আমাদের সংকীর্ণ করে, আর সৃষ্টিশীলতা আমাদের মুক্ত করে। প্রকৃতি যেমন ফুল ফুটিয়ে নিজেকে পূর্ণ করে, তেমনি মানুষও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্বকে প্রসারিত করে। তাই সম্পদ মানে বস্তুগত অর্জন নয়, বরং জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ।
বইটি পড়তে পড়তে আমি প্রায়ই বিস্মিত হয়েছি কতটা আগে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সেই চিন্তার শক্তি, যেটি পরবর্তীতে মনোবিজ্ঞান, দর্শন, এমনকি আধুনিক কোয়ান্টাম ধারণায়ও দেখা যায়। তাঁর ধারণা কৃতজ্ঞতা আমাদের গ্রহণ করার ক্ষমতাকে প্রসারিত করে, আর আমরা যা গভীরভাবে কল্পনা করি, তা বাস্তবে রূপ নেয়।
কিন্তু The Science of Getting Rich এর প্রকৃত মহিমা এর নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। যেমন ধনী হওয়া মানে অন্যের থেকে কেড়ে নেওয়া নয়, বরং সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্বে নতুন মূল্য যোগ করা। ওয়াটলস দরিদ্রতাকে রোমান্টিক করে দেখান না, আবার লোভকেও প্রশ্রয় দেন না। তাঁর মতে ধনী হওয়া প্রকৃতিরই এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যেভাবে ফুল ফোটে, সমুদ্রে জোয়ার-ভাঁটা হয়, তেমনি মানুষও নিজের ভেতরের সম্ভাবনাকে প্রকাশ করতে চায়। তিনি লিখেছেন, “You must get rich, because you can render to God and humanity no greater service than to make the most of yourself.” অর্থাৎ তুমি যখন নিজের সেরাটা প্রকাশ করো, তখনই তুমি সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনার অংশ হয়ে ওঠো। বাক্যটি কেবল উচ্চাকাঙ্ক্ষার যুক্তি বহন করেনা বরং আত্ম-উন্নতির আহ্বান নিয়ে আসে।
ওয়াটলস এর এই ভাবনাটি আমাকে থোরোর Walden এর কথা মনে করিয়ে দেয়। যেখানে তিনি লিখেছিলেন, “The cost of a thing is the amount of life which is required to be exchanged for it.” ওয়াটলস ও ঠিক তাই বলেছেন। তোমার ধন শুধু অর্থে নয়, জীবনের গভীরতায় মাপো।
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে প্রাচুর্যই প্রদর্শনের প্রতীক, আর সাফল্য হয়ে দাঁড়িয়েছে তুলনার খেলা। এই বাস্তবতার ভেতর The Science of Getting Rich আমাকে অন্যরকমভাবে ভাবতে শেখায়। কারণ সত্যিকারের প্রাচুর্য কখনো অন্যের ক্ষতির বিনিময়ে আসে না। তা আসে যখন আমরা নিজের সম্ভাবনাকে চূড়ান্তভাবে ব্যবহার করি, কৃতজ্ঞতা ও বিশ্বাসে ভর করে সৃষ্টির পথে হাঁটি। কৃতজ্ঞতা আসলে মানসিক সমৃদ্ধির প্রথম সিঁড়ি। ওয়াটলস বলেন, “The grateful mind is constantly fixed upon the best; therefore it tends to become the best.” এই বাক্যটি আমার কাছে দোয়ার মতো লাগে। প্রতিদিনের সাধারণ জীবনে ভালোকে খুঁজে নেওয়া, আর সেই ভালোত্বকে নিজের ভেতরে স্থাপন করা। এই ই তো জীবন!
তাছাড়া দিনশেষে চিন্তার সঠিক ধরনই সমৃদ্ধির উৎস। আর যখন এই ধারণাটি পড়ছিলাম, ঠিক তখনই মনে পড়ল রুমির “What you seek is seeking you” পঙ্ক্তি। যা তুমি মন থেকে চাও, তা ই তোমার দিকে এগিয়ে আসে, যদি তুমি নিজের মধ্যে সৃষ্টির শক্তিকে মুক্ত করো।
সবশেষে আমি বলবো, The Science of Getting Rich বইটি চিন্তা বা ধারণার জগতে একধরণের আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। যেখানে ধনী হওয়া মানে শুধু অর্থে সমৃদ্ধ হওয়া না, বরং মন, আত্মা, ও সম্পর্কের পরিসরে পূর্ণতা অর্জন করা। বইটি শেষ করার পর একটি বিষয়ই বেশি করে অনুভব করেছি যে অর্থ-প্রাচুর্য আসলে চিন্তার এক অবস্থা। যে মন কৃতজ্ঞ, যে মন সৃষ্টিশীল, সে-ই প্রকৃত অর্থে ধনী।


