মানুষের না, কিছু ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের গল্পঃ চরিত্রহীন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
কিছু বই শেষ হলে মনে হয় একটা দীর্ঘ ভ্রমণ থেকে ফিরলাম। যে ভ্রমণে পথে পথে কাঁটা ছিল, ধুলো ছিল, বৃষ্টি ছিল আর ছিল এক অদ্ভুত উষ্ণতা যা আঁকড়ে ধরে থাকে বুকের ভেতরে। শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীন পড়া শেষ করে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ভার। মনে হচ্ছিল কাউকে খুব অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া হয়েছে আর আমি দাঁড়িয়ে দেখেছি, কিছু করিনি।
এই উপন্যাসটি পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে কোন একজন মানুষ বইটি লিখেননি। এটি লিখেছে সেই সমাজ নিজেই, যে সমাজ তার নিজের পাপের ভার বহন করতে পারে না। তবু সেই ভার অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে এক মুহূর্তও দেরি করে না। শরৎচন্দ্র কলমটি শুধু ধরেছিলেন কথা বলেছিল সমাজের সেই নিষ্ঠুর নীরবতা।
আমি শরৎচন্দ্রের অনেক বই পড়েছি। তবে চরিত্রহীন একটু আলাদা। এই বই পড়ে মনে হল শরৎচন্দ্র নিজেও ক্ষতবিক্ষত ছিলেন। কারণ এতো কাছ থেকে না দেখলে, এতো গভীরে না গেলে এই কথাগুলো লেখা যায় না।
উপন্যাসের শুরু হয় উপেন্দ্রকে ঘিরে। উপেন্দ্র একজন শিক্ষিত, ভদ্র ও নীতিবান মানুষ। তার বন্ধু সতীশ। একজন আবেগপ্রবণ, উদার ও হৃদয়বান তরুণ। সতীশের জীবনে আসে সাবিত্রী। সমাজের চোখে সাবিত্রী ব্রাহ্মণের মেয়ে, বিধবা, সুরূপা, লেখাপড়া জানা একজন সাধারণ মেয়ে। তবে তার হৃদয়ে ছিল সমুদ্রের মতো গভীর ভালোবাসা।
সাবিত্রী সতীশকে ভালোবাসত। তবে তার ভালোবাসায় ছিল না কোনো দাবি, কোনো অধিকার বা কোনো স্বপ্নের প্রাসাদ। সে ভালোবাসত নিঃশব্দে, দূর থেকে, যেন সন্ধ্যার আকাশে জ্বলে ওঠা একটি তারা। যার আলো দেখা যায় কিন্তু ছোঁয়া যায় না।
সতীশও সাবিত্রীর প্রতি দুর্বল ছিল। কিন্তু সমাজের দেয়াল তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল। সেই দেয়াল ছিল শ্রেণির, অবস্থানের, পরিচয়ের। অনেক সময় মানুষ মানুষকে হারায় না। মানুষ হারায় সমাজের ভয়ে। সতীশ আর সাবিত্রীর গল্পও তেমন।
অন্যদিকে উপন্যাসে আসে কিরণময়ী। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জটিল ও সবচেয়ে করুণ নারী চরিত্রগুলোর একটি বলে আমার মনে হয়েছে। কিরণময়ীর বিয়ে হয়েছিল এমন একজন মানুষের সাথে যিনি তার স্বামী ছিলেন ঠিকই কিন্তু তার হৃদয়ের সঙ্গী হতে পারেননি। সংসার ছিল, কিন্তু ভালোবাসা ছিল না। ছাদ ছিল, কিন্তু আশ্রয় ছিল না।
একটি পাখিকে যদি সোনার খাঁচায় বন্দি করা হয়, তবুও কি সে স্বাধীন হয়? কিরণময়ীর জীবন ছিল সেই সোনার খাঁচার মতো। সে ছিল সুন্দরী, বুদ্ধিমতী, প্রাণবন্ত। কিন্তু তার চারপাশের পৃথিবী তাকে বুঝতে শেখেনি। তার হাসির পেছনের শূন্যতা কেউ দেখেনি। তার নীরবতার ভেতরের কান্না কেউ শোনেনি।
উপেন্দ্রের মধ্যে সে খুঁজে পেয়েছিল এমন একজন মানুষ যে তাকে সম্মান করে, বুঝতে পারে। সেই শ্রদ্ধা ধীরে ধীরে ভালোবাসায় রূপ নেয়। কিন্তু সেই ভালোবাসার কোনো ঠিকানা ছিল না। কারণ সমাজ ভালোবাসার চেয়ে নিয়মকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
কিরণময়ী ভুল করেনি শুধু ভালোবাসতে চাওয়ার জন্য। কিন্তু সমাজ তাকে সেই সুযোগ দেয়নি। ধীরে ধীরে সন্দেহ, গুজব আর অপবাদের কালো মেঘ তাকে ঘিরে ফেলে। মানুষ তার চোখের জল দেখে না, শুধু তার দিকে আঙুল তোলে। কিরণময়ী একসময় সমস্ত সম্পর্ক, সমস্ত আশ্রয় হারাতে থাকে। তার চারপাশের মানুষ তাকে বুঝতে ব্যর্থ হয়। যে নারী একদিন ভালোবাসা খুঁজছিল, সে ধীরে ধীরে একাকিত্বের মরুভূমিতে হারিয়ে যায়।
যে সমাজ একজন পুরুষের ভুলকে অভিজ্ঞতা বলে, সেই সমাজ একজন নারীর ভুলকে চরিত্রহীনতা বলে। শরৎচন্দ্র যেন এই নিষ্ঠুর সত্যটিই বারবার আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন।
অন্যদিকে সাবিত্রীর জীবনও সহজ ছিল না। সে জানত তার ভালোবাসার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তবুও সে সতীশকে ভালোবেসে গেছে। ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর রূপ হয়তো এটাই। যেখানে পাওয়ার চেয়ে দেওয়া বড় হয়ে ওঠে। সাবিত্রী নিজের সুখের চেয়ে সতীশের মঙ্গলকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল।
অনেকেই ভালোবাসে। কিন্তু সবাই আত্মত্যাগ করতে পারে না। তবে সাবিত্রী পেরেছিল।
উপন্যাসের শেষভাগে প্রতিটি চরিত্র যেন নিজেদের ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ জয়ী হয় না। কেউ পুরোপুরি সুখী হয় না। শুধু সময় এগিয়ে যায়। আর পিছনে পড়ে থাকে কিছু অপূর্ণ প্রেম, কিছু ভাঙা স্বপ্ন, কিছু অশ্রু এবং কিছু প্রশ্ন।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো- চরিত্রহীন আসলে কে?
সাবিত্রী? যে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছিল?
কিরণময়ী? যে শুধু একটু ভালোবাসা আর বোঝাপড়া চেয়েছিল?
নাকি সেই সমাজ যে মানুষের সমগ্র জীবনকে না জেনে একটি শব্দে বিচার করে ফেলেছিল?
উপন্যাস শেষ হয়ে যায়, কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর শেষ হয় না। আর আমার মতো পাঠকের ভেতরে তা রয়ে যায়।
সমাজ- যে চরিত্রে নেই কিন্তু সবচেয়ে বড় ভিলেন
চরিত্রহীন উপন্যাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর চরিত্র হলো সমাজ নিজেই। কারণ তার কোনো মুখ নেই, নাম নেই, ঠিকানা নেই। কিন্তু সে সবখানে আছে।
পাড়ার মুদিখানায় আছে যেখানে লোকে নিচু গলায় কথা বলে। উঠোনের কোণে আছে যেখানে মহিলারা মাথার উকুন বাছতে বাছতে কারো সম্পর্কে মন্তব্য করেন। পারিবারিক অনুষ্ঠানে আছে যেখানে চোখের ভাষায়, ঠোটের কোণা দিয়েই অনেক কিছু বলা হয়ে যায়।
শরৎচন্দ্র এই সমাজকে কখনো সরাসরি আক্রমণ করেননি। তিনি শুধু দেখিয়েছেন। আর দেখানোটা এতো নিখুঁত হয়েছে যে পাঠক নিজেই বুঝতে পারে এই সমাজ আসলে অসুস্থ।
একটা উদাহরণ দিই। আমাদের দেশে কোন পুরুষের স্ত্রী মারা যাওয়ার সাথে সাথেই তিনি আরেকটা বিয়ের পিড়িতে বসেন। যেটা স্বাভাবিক। কিন্তু একই কাজটা যদি একজন মেয়ে করেন তাহলে তাকে আগেই ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হবে যে “পাত্র আগে থেকেই জোগাড় ছিল।” এই দ্বিচারিতা চরিত্রহীন-এ শরৎচন্দ্র দেখিয়েছেন একশো বছরেরও বেশি আগে। আজও সেটা বদলায়নি।
প্রেম- এই বইয়ে প্রেম কী?
চরিত্রহীন একটা প্রেমের উপন্যাস। কিন্তু এখানে প্রেম রোমান্টিক না। এখানে প্রেম হলো একটা মানবিক টান। দুটো মানুষের মধ্যে যে সংযোগ তৈরি হয় শুধু মানুষ হওয়ার কারণে সেটাই।
সাবিত্রী সতিশকে ভালোবাসে। সতিশ সাবিত্রীকে ভালোবাসে। কিন্তু এই ভালোবাসা কখনো পরিপূর্ণ হয় না। কারণ মাঝখানে একটা দেওয়াল আছে। সেই দেওয়ালের নাম সমাজ। এই দেওয়ালটা অদৃশ্য কিন্তু অভেদ্য।
আমি অনেকবার ভেবেছি কেন শরৎচন্দ্র এই দুজনকে একসাথে হতে দেননি? কেন সুখী সমাপ্তি নেই? উত্তর পেয়েছি- কারণ বাস্তবে সুখী সমাপ্তি নেই। অন্তত সেই সময়ে না। হয়তো এই সময়েও না। শুধু নামগুলো বদলেছে গল্পটা একই।
“চরিত্র” শব্দটার আসল অর্থ কী?
উপন্যাসের নামটা নিয়ে অনেকক্ষণ ভেবেছি। চরিত্রহীন মানে হলো যার চরিত্র নেই। সমাজ সাবিত্রীকে এই নাম দিয়েছে।
কিন্তু পুরো উপন্যাস পড়ে মনে হয় চরিত্র যদি থাকে তাহলে সাবিত্রীরই আছে। সে সৎ। সে নিজের প্রতি সৎ, অন্যের প্রতি সৎ। সে মিথ্যে দিয়ে নিজেকে ঢাকে না। সে সমাজকে খুশি করতে নিজেকে বিকিয়ে দেয় না। বরং যাদের সমাজ ভদ্রলোক বলে তাদের অনেকের ভেতরে কী আছে? ভেতরে এক, বাইরে আরেক। সেটা কি চরিত্র?
শরৎচন্দ্র এই প্রশ্নটা সরাসরি করেননি। কিন্তু বইটা পড়লে প্রশ্নটা নিজেই মাথায় আসে। আর সেটাই ভালো সাহিত্যের কাজ। উত্তর দেওয়া না, প্রশ্ন তৈরি করা।
শেষ কথা- যে বই শেষ হয় না
বইটা বন্ধ করার পর যে অনুভূতি হয় সেটা বর্ণনা করা কঠিন। একটু রাগ আছে সমাজের উপর। একটু দুঃখ আছে সাবিত্রীর জন্য। একটু লজ্জা আছে নিজের জন্য। আর একটা অদ্ভুত কৃতজ্ঞতা আছে শরৎচন্দ্রের জন্য। কারণ এতো কঠিন সত্য এতো সুন্দরভাবে বলার ক্ষমতা সবার থাকে না।
চরিত্রহীন পড়া উচিত একটাই কারণে। এটা তোমাকে ভালো মানুষ হতে বলে। তবে চিৎকার করে না, বক্তৃতা দিয়ে না, শুধু একটা গল্প বলে। আর সেই গল্প পড়তে পড়তে তুমি নিজেই বুঝতে পারো যে কোথায় ভুল হচ্ছে, কোথায় আমরা সবাই মিলে একজন সাবিত্রীকে একা করে দিচ্ছি।
এই বই কোনো সমাধান দেয় না। কিন্তু প্রশ্নটা দেয়। আর প্রশ্নটা একটুও পুরনো হয়নি। আমি আশা করি, একদিন এই প্রশ্নের উত্তর হবে। একদিন সমাজ বলবে না “তুমি চরিত্রহীন।” সেদিন হয়তো এই বইটার দরকার থাকবে না। কিন্তু সেদিন না আসা পর্যন্ত চরিত্রহীন থাকুক প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি মানুষের হাতে।


