একটা ছোট ছেলে পুরোনো এক ছবির দিকে তাকিয়ে আছে। ছবিতে একজন মানুষ আছেন। ছেলেটি জানে এই মানুষটি তার বাবা। কিন্তু তাকে নিয়ে তার নিজের কোনো স্মৃতি নেই। বাবার কণ্ঠ সে মনে করতে পারে না। তার সঙ্গে কাটানো কোনো বিকেল নেই। বাবার হাত ধরে হাঁটার কোনো দৃশ্য নেই। তবু সেই মানুষটির রক্ত তার শরীরে।
একদিন সেই ছেলেটি বড় হয়। তখন ছেলেটির মনে একটা প্রশ্ন জন্ম জাগে- যে মানুষটাকে আমি প্রায় চিনিই না তিনি আমার ভেতরে কতোটা রয়ে গেছেন? Dreams from My Father: A Story of Race and Inheritance মূলত এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজতে বেরিয়ে পড়া এক মানুষের গল্প।
Barack Obama-র জন্ম ১৯৬১ সালে হাওয়াইতে। তার বাবা Barack Obama Sr. ছিলেন কেনিয়ার একজন তরুণ যিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। সেখানেই তার পরিচয় হয় Ann Dunham-এর সঙ্গে। তাদের দুজনে’র বিয়ে হয় এবং জন্ম নেন Barack Obama Jr.
কিন্তু বাবা-মায়ের সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। Obama যখন খুব ছোট তার বাবা কেনিয়ায় ফিরে যান। ফলে বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক ক্রমে পরিণত হয় দূরত্বের সম্পর্কে। বাবাকে তিনি চিনতেন মূলত ছবি, অল্প কিছু স্মৃতি ও পরিবারের মানুষের মুখে শোনা গল্পের মাধ্যমে।
কয়েক বছর পর বাবা আবার যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। কিন্তু সেই ফিরে আসা ছিল ক্ষণিকের। তারপর ১৯৮২ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় Obama Sr. মারা যান। তখন Obama-র বয়স একুশের কাছাকাছি।
একজন তরুণের জীবনে বাবার মৃত্যু এমনিতেই গভীর শূন্যতা তৈরি করতে পারে। কিন্তু Obama-র ক্ষেত্রে সেই শূন্যতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আরও একটা অনুভূতি। তিনি এমন একজন মানুষকে হারিয়েছিলেন যাকে তিনি আসলে পুরোপুরি চিনতেই পারেননি। মৃত্যু তখন শুধু একজন বাবাকে তার কাছ থেকে কেড়ে নেয়নি। কেড়ে নিয়েছিল বাবাকে জানার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাটুকুও।
তাই বাবার মৃত্যুর পর তার মনে জাগা বিভিন্ন প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। আমার বাবা কে ছিলেন? কেনিয়া থেকে আসা সে মানুষটি কী স্বপ্ন দেখতেন? কেন তার জীবন এমনভাবে ভেঙে গেলো? তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ব্যর্থতা, সম্পর্ক, সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে তাকে তৈরি করেছিলো? আর সবচেয়ে বড় কথা তার জীবনের কোন অংশটি আমার মধ্যে এসে বেঁচে আছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজতেই Obama একসময় কেনিয়ার পথে যাত্রা শুরু করেন। আর কেনিয়ায় যাবার জার্নি’টাই মূলত এই বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি।
কেনিয়ায় পৌঁছে তিনি বাবার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। তাদের কাছ থেকে জানতে থাকেন তার বাবার শৈশব, পরিবার, শিক্ষা, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের নানা গল্প। যে বাবাকে তিনি এতোদিন দূর থেকে, অসম্পূর্ণ কিছু স্মৃতির মধ্য থেকে চিনেছেন, ধীরে ধীরে তার সামনে সেই মানুষটার একটা বাস্তব চেহারা তৈরি হতে থাকে।
কিন্তু সে মানুষটা নিখুত কোন নায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন মেধাবী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। নিজের জীবন বদলে দেওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। একই সঙ্গে তার মধ্যে বিরাজমান ছিল ভুল, দুর্বলতা, সম্পর্কের জটিলতা। এতদসত্তেও এমন কিছু চয়েস মেকিং তিনি করেছেন যার পরিণতি তাকে ও তার পরিবারকে বহন করতে হয়েছিল।
এখানে বইটি আমার হৃদয়কে আরও বেশি ছুঁয়ে যায়। কারণ Obama চাইলে তার বাবাকে শুধু একজন অনুপস্থিত বাবা হিসেবে বিচার করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি। বরং তার বাবাকে একজন মানুষ হিসেবে বোঝার চেষ্টা করেছেন। আমার কাছে এটাই বইটির সবচেয়ে মানবিক দিক মনে হয়েছে।
ছোটবেলায় আমরা বাবা-মাকে শুধু বাবা-মা হিসেবেই দেখি। তারা যেন আমাদের জীবনের শুরু থেকেই বড় হয়ে থাকা মানুষ। আমরা ভুলে যাই তারাও একদিন শিশু ছিলেন। তাদেরও কিছু স্বপ্ন ছিল। কিছু ভয় ছিল। কিছু ভুল ছিল। তাদেরও এমন কিছু দরজা ছিল যেগুলো তারা খুলতে পারেননি।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝতে শিখি বাবা-মায়েরা সবসময় আমাদের কল্পনার মতো শক্তিশালী ছিলেন না। তারাও তাদের সময়, সমাজ, পরিস্থিতি ও নিজেদের সীমাবদ্ধতার ভেতর দিয়ে জীবন পার করেছেন।
Obama তার বাবাকে জানতে গিয়ে সেই সত্যের মুখোমুখি হন। আর বাবাকে বোঝার এই ব্যক্তিগত যাত্রা ধীরে ধীরে তাকে নিজের পরিচয়ের আরও বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।
Obama-র বাবা আফ্রিকান। তার মা আমেরিকান। তিনি কৃষ্ণাঙ্গ উত্তরাধিকার বহন করেন। আবার বেড়ে উঠেছেন মূলত আমেরিকান সমাজে। ফলে ছোটবেলা থেকেই তার পরিচয়ের ভেতরে একাধিক পৃথিবী পাশাপাশি ছিল।
কিন্তু মানুষ কি শুধু তার গায়ের রং? শুধু তার বাবার দেশ? শুধু তার মায়ের পরিবার? নাকি পরিচয় এমন একটা জিনিস যা মানুষকে সারাজীবন তৈরি করতে হয়?
Dreams from My Father এই প্রশ্নগুলোর সহজ উত্তর দেয় না। বরং Obama-র নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রশ্নগুলোকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
আমেরিকায় বেড়ে ওঠার সময় তিনি বর্ণবৈষম্যের বাস্তবতার মুখোমুখি হন। নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বিধা, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের দীর্ঘ ইতিহাস তাকে ভাবতে বাধ্য করে। তিনি বুঝতে শুরু করেন, নিজের পরিচয় শুধু তার ব্যক্তিগত বিষয় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা জাতির ইতিহাস, আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের সংগ্রাম ও আমেরিকার দীর্ঘ বর্ণ-রাজনীতি। তারপর কেনিয়ায় এসে তিনি নিজের বাবার ইতিহাসের সঙ্গে সেই বৃহত্তর ইতিহাসকে একসঙ্গে দেখতে শুরু করেন।
একজন বাবাকে খোঁজতে গিয়ে তিনি একটা পরিবারকে আবিষ্কার করেন। একটা পরিবারকে জানতে গিয়ে তিনি একটা সমাজকে দেখতে পান। আর একটা সমাজকে বুঝতে গিয়ে তিনি নিজের পরিচয়ের দিকে ফিরে তাকান।
আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো উত্তরাধিকার নিয়ে পৃথিবীতে আসি। শুধু সম্পত্তি না। আমরা উত্তরাধিকার হিসেবে পাই গল্প, ভাষা, বিশ্বাস, ক্ষত, ভয়, ভালোবাসা ও অসমাপ্ত স্বপ্ন। কখনো সেই উত্তরাধিকার আমাদের শক্তি দেয়। কখনো তা আমাদের ভেতরটাকে দুমড়ে মোচড়ে রাখে। তবে আমাদের সামনে শেষ পর্যন্ত একটা স্বাধীন কাজ থেকেই যায়- আমরা সেই উত্তরাধিকার নিয়ে কী করবো?
Obama তার বাবার উত্তরাধিকারকে অন্ধভাবে গ্রহণ করেননি। আবার তা অস্বীকারও করেননি। তিনি তার দিকে ফিরে তাকিয়েছেন। প্রশ্ন করেছেন। ব্যথার জায়গাগুলো দেখেছেন। ভালোবাসার জায়গাগুলোও দেখেছেন। তারপর নিজের জীবনের জন্য একটা নতুন অর্থ তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। এ কারণেই বইটার নাম Dreams from My Father আমার কাছে অত্যন্ত সুন্দর লেগেছে।
বাবার স্বপ্ন আর সন্তানের স্বপ্ন কি একই?
হয়তো না।
তবে একটা মানুষের স্বপ্ন অন্য মানুষের জীবনে বীজের মতো থেকে যেতে পারে। সেই বীজ থেকে ঠিক কী জন্মাবে তা পরের মানুষটির ওপর নির্ভর করে।
Obama-র বাবার জীবন অসম্পূর্ণ ছিল। কিন্তু সেই অসম্পূর্ণতার ভেতর থেকেও তার ছেলে নিজের একটা পূর্ণতর গল্প তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।
এই বই তাই শুধু বাবাকে খোঁজার গল্প না। এটা নিজের শিকড়ের দিকে ফিরে তাকানোর গল্প। কারণ নিজের অতীত থেকে পালিয়ে গেলে আমরা হয়তো সামনে এগিয়ে যেতে পারি, কিন্তু নিজেদের পুরোপুরি বুঝতে পারি না। তাছাড়া অতীতকে বোঝা মানে তার কাছে বন্দি হয়ে থাকা না। বরং তার দিকে তাকিয়ে নিজের অবস্থানটুকু বুঝে নেওয়া।
হয়তো বড় হয়ে ওঠার অর্থই এটাই।
একসময় আমরা বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে পৃথিবীতে আসি। তারপর ধীরে ধীরে নিজেদের মানুষ হয়ে উঠি। সেই পথে আমাদের ঠিক করতে হয় কোন স্বপ্ন আমরা বহন করবো আর কোন ভুল থেকে দূরে থাকবো। কোন ক্ষতকে আর পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দেবো না।
Obama তার বাবাকে খোঁজতে কেনিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু এ জার্নি’র শেষে তিনি শুধু তার বাবার গল্পই জানতে পারেননি, নিজের সম্পর্কেও অনেক কিছু বুঝতে পেরেছিলেন।
হয়তো আমাদের সবার জীবনেই এমন কিছু অনুপস্থিত মানুষ থাকে যাদের সম্পর্কে আমরা উত্তর খুঁজি। মনে হয়, তাদের বুঝতে পারলেই নিজেদেরও বুঝতে পারবো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা আবিষ্কার করি, অন্য একজন মানুষকে বোঝার যাত্রা আসলে নিজের কাছেই ফিরে আসার যাত্রা।
Dreams from My Father সেই ফিরে আসার গল্প।
একজন ছেলে তার বাবাকে খোঁজতে বেরিয়েছিল। পথের শেষে সে আবিষ্কার করলো বাবার গল্পের ভেতরেই তার নিজের গল্পের কিছু পৃষ্ঠা লুকিয়ে ছিল। আর সে পৃষ্ঠাগুলো পড়তে পড়তেই সে বুঝতে শিখলো- আমরা আমাদের অতীত না ঠিকই তবে সেই অতীতের গল্পগুলো মিলেই তো আজকের আমরা।


