চারজন মানুষ। চার রকম জীবন। তবু কোথাও যেন একটা জায়গায় এসে তাদের মন খারাপের বিষয়টা এক হয়ে যায়।
জয়িতা, সুদীপ, আনন্দ আর কল্যাণের জীবন শুরুতে খুব আলাদা কিছু না। পড়াশোনা আছে, বন্ধুত্ব আছে, নিজের মতো করে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার সময় আছে। কিন্তু চারপাশের মানুষগুলোর জীবন দেখতে দেখতে তাদের মনে প্রশ্নরা জাল বুনতে শুরু করে।
শুধু নিজে ভালো থাকাটাই কি যথেষ্ট?
অন্যায় দেখেও কি স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকা যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তারা ধীরে ধীরে নিজেদের চেনা জীবন থেকে দূরে সরে যায়। সামনে কী আছে তা তারা জানে না। কতোটা হারাতে হবে সেটাও জানে না। শুধু জানে আগের মতো করে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব না।
সমরেশ মজুমদারের গর্ভধারিণী আমার কাছে সেই চারজন মানুষের গল্প যারা চাইলেই নিজেদের জন্য একটা সহজ জীবন বেছে নিতে পারতো। কিন্তু তারা অন্য একটা পথ বেছে নিয়েছিল। সেই পথের গল্পে আছে বন্ধুত্ব, স্বপ্ন, ভালোবাসা, দ্বিধা-সংশয়, কিছু ভুলভাল ঘটনা আর অনেকখানি ত্যাগ। এসব কিছুর পরেও একটা প্রশ্ন যেটা বইটা শেষ হওয়ার পরও মাথায় ঘুরতে থাকে- অন্যায় দেখে চুপ করে থাকা সহজ। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে আমরা নিজের জীবন থেকে কতোটুকু ত্যাগ করতে প্রস্তুত?
উপন্যাসের কেন্দ্রে চার তরুণ-তরুণী- জয়িতা, সুদীপ, আনন্দ ও কল্যাণ। চারজন এসেছে চার রকম পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতা থেকে। প্রেসিডেন্সি কলেজে তাদের বন্ধুত্ব শুধু চারটি মানুষের বন্ধুত্ব হয়ে থাকে না। ধীরে ধীরে তা একটি অভিন্ন স্বপ্নের জন্ম দেয়। তারা এমন একটি সমাজ দেখে যেখানে অন্যায় আছে, বৈষম্য আছে, দুর্নীতি আছে ঠিকই তবে অধিকাংশ মানুষ নিজের নিরাপদ জীবনের বাইরে তাকাতে অনিচ্ছুক।
এখানেই উপন্যাসটি আমাকে থামিয়ে দেয়।
কারণ আমার কাছে মনে হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা ততোক্ষণই সহজ, যতোক্ষণ না সেই কথার কোনো মূল্য দিতে হয়।
চারজনের প্রত্যেকের মধ্যেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আছে কিন্তু তাদের স্বভাব এক না। সুদীপ আবেগপ্রবণ, রগচটা কিন্তু দুঃসাহসী। তার ভেতরের ক্ষোভ যেন দ্রুত সিদ্ধান্তে রূপ নিতে চায়। আনন্দ তার বিপরীত মেরুর মানুষ। ঠান্ডা মাথায় ভাবতে পারে। কথার মাধ্যমে অন্যকে প্রভাবিত করতে পারে। কল্যাণ মেধাবী কিন্তু তার ভেতরে মধ্যবিত্ত সংস্কার ও দ্বিধার উপস্থিতি স্পষ্ট। আর জয়িতা সম্ভবত চারজনের সবচেয়ে জটিল চরিত্র। বিপদের মুহূর্তে তার উপস্থিত বুদ্ধি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং পরবর্তী আত্মত্যাগ তাকে কেবল দলের নারী সদস্য হিসেবে না বরং গল্পের নৈতিক ও আবেগিক কেন্দ্র হিসেবে দাঁড় করায়।
জয়িতাকে পড়তে পড়তে মনে হয়েছে কোনো চরিত্রের শক্তি তার কথায় না বরং সংকটের মুহূর্তে সে কী বেছে নেয় সেখানেই তার শক্তির আসল পরীক্ষা।
চার বন্ধুর স্বপ্ন ছিল সমাজের অন্যায়কে নিয়ে আলোচনা না করে তার বিরুদ্ধে কিছু করা। এখানেই গর্ভধারিণী প্রচলিত তরুণ-তরুণীর গল্প থেকে আলাদা হয়ে যায়। তারা রাজনৈতিক দলের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পরিবর্তনের অপেক্ষা করতে চায় না। তারা নিজেরাই দায়িত্ব নিতে চায়। এই সিদ্ধান্তই তাদের গল্পকে রোমাঞ্চের দিকে নিয়ে যায়। আবার একই সঙ্গে নৈতিকতার কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আর পরিবর্তনের পদ্ধতি কি একইভাবে ন্যায়সঙ্গত?
এই প্রশ্নটির সহজ কোন উত্তর নেই।
সমরেশ মজুমদার সম্ভবত ইচ্ছা করেই পাঠককে একটি কমফোর্টেবল নৈতিক অবস্থান দেননি। চারজনের স্বপ্নকে বোঝা যায়। তাদের ক্ষোভকে বোঝা যায়। তাদের চারপাশের সমাজের অসংগতিগুলোও বোঝা যায়। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্তের নৈতিক জটিলতাও অস্বীকার করা যায় না।
এই দ্বন্দ্বই বইটিকে আমার কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে।
কারণ বাস্তব জীবনও তো এমন। আমরা সবাই ন্যায় চাই। কিন্তু ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথ নিয়ে একমত নই। আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই কিন্তু কখনো কখনো আমাদের নিজেদের বিশ্বাসই প্রশ্নের মুখে পড়ে। একজন মানুষ যখন পৃথিবীকে বদলাতে চায় তখন খুব সহজেই সে নিজেকে পৃথিবীর বিচারকের আসনে বসিয়ে ফেলতে পারে।
গর্ভধারিণী- আমার কাছে প্রথমে মাতৃত্বের বই মনে হয়েছে। কিন্তু পড়ার পর এর অর্থ অনেক বিস্তৃত হয়ে যায়। গর্ভে যেমন একটি নতুন জীবনের সম্ভাবনা ধারণ করা হয় তেমনই মানুষ তার ভেতরে ধারণ করে একটি স্বপ্ন, একটি বিশ্বাস, একটি ভবিষ্যতের কল্পনা। চার তরুণও যেন তাদের সময়ের ভেতরে একটি নতুন সমাজের স্বপ্ন ধারণ করে।
কিন্তু কোনো স্বপ্নকে ধারণ করা আর তাকে পৃথিবীতে জন্ম দেওয়া এক জিনিস না।
স্বপ্ন জন্ম দিতে হলে তার মূল্যও দিতে হয়।
এই চারজন সেই মূল্য দেওয়ার পথেই এগিয়ে যায়। কেউ আহত হয়, কেউ ভেঙে পড়ে, কেউ নিজের পরিচিত জীবন থেকে দূরে সরে যায়। শেষ পর্যন্ত তাদের পথ চলে যায় এমন এক পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে যেখানে সভ্যতার প্রচলিত কাঠামো থেকে অনেক দূরে তারা নিজেদের স্বপ্নকে অন্যভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। সেখানে জয়িতার আত্মত্যাগ ও সাধনা গল্পটিকে নতুন মাত্রা দেয়।
এখানে গর্ভধারিণী কেবল বিপ্লবের গল্পে সীমাবদ্ধ থাকে না। হয়ে ওঠে নির্মাণের গল্প। কারণ যেকোন জিনিসের ধ্বংস তুলনামূলকভাবে দৃশ্যমান হলেও একটি নতুন জীবন তৈরি করা অনেক দীর্ঘ ও কঠিন কাজ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মুহূর্ত তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু মানুষের জীবন বদলাতে হলে যে ধৈর্য, শ্রম, মমতা ও আত্মসংযম দরকার সেটিই সম্ভবত আরও বড় পরীক্ষা।
এই জায়গায় এসে জয়িতার চরিত্রটি আমার কাছে বিশেষ অর্থ পায়। কারণ সে শুধু প্রতিবাদ করে না, সে ধারণ করে। নিজের ভেতরে একটি বিশ্বাসকে বহন করে নিয়ে যায়। এবং শেষ পর্যন্ত সেই বিশ্বাসকে জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত করে। তাই বইয়ের নামটি আমার কাছে শেষ পর্যন্ত একজন নারীর পরিচয়ের চেয়ে অনেক বড় হয়ে ওঠে।
গর্ভধারিণী মানে হয়তো সেই মানুষ যে ভবিষ্যৎকে নিজের ভেতরে ধারণ করার সাহস রাখে।
তবে বইটি পড়ে আমি চারজনকে নিখুঁত নায়ক হিসেবে দেখিনি। বরং তাদের ভুল, আবেগ, দ্বিধা এবং সীমাবদ্ধতাই তাদের মানবিক করেছে। তারা পৃথিবী বদলাতে চায়, কিন্তু তারাও সেই পৃথিবীরই সন্তান। তাদের ভেতরেও আছে শ্রেণি, পরিবার, সংস্কার ও ব্যক্তিগত ইতিহাসের ছাপ। এই বৈপরীত্যই তাদের বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
সমরেশ মজুমদারের শক্তি এখানেই- তিনি আমাদের সামনে চারজন আদর্শ মানুষ দাঁড় করাননি। দাঁড় করিয়েছেন চারজন অসম্পূর্ণ মানুষ যারা একটি সম্পূর্ণ পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে।
পৃথিবী বদলানোর স্বপ্ন দেখা মানুষদেরও পৃথিবীরই মানুষ হতে হয়।
গর্ভধারিণী তাই শুধু চার বন্ধুর গল্প না। এটা তারুণ্যের সেই অস্থিরতার গল্প যখন পৃথিবীকে দেখে মনে হয় “এভাবে তো কোনকিছু চলতে পারে না।” গর্ভধারিণী বিশ্বাসের গল্প, প্রতিবাদের গল্প, বন্ধুত্বের গল্প, আত্মত্যাগের গল্প বটেই কিন্তু গর্ভধারিণী সবচেয়ে বেশি একটা প্রশ্নের গল্প-
আমরা কি শুধু উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই পৃথিবীটাকেই বয়ে নিয়ে যাবো, নাকি আমাদের ভেতরেই এমন এক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবো, যা একদিন আমাদের পরের প্রজন্মের পৃথিবী হয়ে উঠবে?
বইটি সেই উত্তরের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং প্রশ্নটি আমাদের হাতে তুলে দিয়ে চুপ করে যায়। তাই হয়তো কিছু বইয়ের জন্য এর চেয়ে বড় সমাপ্তি আর কিছু হতে পারে না।


