ধরো, পরীক্ষার হলে বসে প্রশ্নপত্রটা হাতে পাওয়ার পর প্রথম কয়েক মিনিট তুমি শুধু প্রশ্নের দিকেই তাকিয়ে আছ। প্রথম প্রশ্নটা কঠিন। দ্বিতীয়টাও পরিচিত লাগছে না। চারপাশে সবাই লিখতে শুরু করেছে। অথচ তোমার মাথায় তখনো একটাই প্রশ্ন “আমি পারব তো?”
এর কিছুক্ষণ পর তুমি তোমার সংবিৎ ফিরে পেয়ে বুঝতে পারো যে আসলে প্রশ্নপত্রটা বদলে ফেলার কোনো উপায় নেই। তাই এখন ভয় পাওয়া কিংবা না-পাওয়া দিয়ে কিছুই হবে না। তোমাকেই কলমটা হাতে তুলে নিতে হবে। হয়তো সব উত্তর জানা নেই, হয়তো কোথাও ভুল হবে। তবুও তোমাকে যেকোন একটা প্রশ্ন দিয়ে লেখা শুরু করতেই হবে।
জীবনও অনেক সময় আমাদের এমনই কিছু প্রশ্নের সামনে বসিয়ে দেয়, যার জন্য আমরা আগে থেকে প্রস্তুত থাকি না।
শৈশবে পৃথিবীটাকে বেশ সহজ মনে হতো। ভালো-মন্দের পার্থক্য স্পষ্ট থাকতো। বিপদকে দূরের কোনো ব্যাপার বলে মনে হতো। আর বন্ধুদের আশেপাশে থাকলেই যথেষ্ট নিরাপত্তা অনুভব করতাম। কিন্তু বড় হতে হতে সেই সরলতাটা একটু একটু করে বদলে যায়। বন্ধুত্বে অভিমান আসে। বিশ্বাসের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। চলার পথে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয় যার ফলাফল আমরা জানি না। তখন বুঝতে শুরু করি বড় হয়ে ওঠা মানে শুধু বয়স বাড়া না বরং অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিজের সিদ্ধান্ত নিতে শেখা।
J. K. Rowling-এর Harry Potter and the Goblet of Fire ঠিক সেই পরিবর্তনের গল্প।
বাইরে থেকে এটা জাদু, ড্রাগন, রহস্য আর এক বিপজ্জনক প্রতিযোগিতায় ভরা একটা থ্রিলার টাইপের বই। কিন্তু গল্পের ভেতরে একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যায় এর আসল সৌন্দর্য সেই জায়গায় যেখানে হ্যারি আর শুধু একটি জাদুর স্কুলের কিশোর থাকে না। তার সামনে এমন কিছু প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় যার উত্তর কোনো বইয়ে লেখা নেই।
তাকে শিখতে হয় কীভাবে ভয়কে সামলাতে হয়। কাকে বিশ্বাস করতে হয়। বন্ধুত্বের টানাপোড়েন কীভাবে পেরোতে হয়। আর সবচেয়ে কঠিন সময়েও নিজের মানবিকতাটুকু কীভাবে ধরে রাখতে হয়।
হ্যারি এবার হগওয়ার্টসে চতুর্থ বছরের ছাত্র। নতুন বছর শুরু হয় কুইডিচ বিশ্বকাপের উত্তেজনা দিয়ে। কিন্তু উৎসবের আনন্দের মধ্যেই ফিরে আসে পুরোনো এক অন্ধকারের ছায়া। ডেথ ইটারদের উপস্থিতি ও আকাশে ভেসে ওঠা ভয়ংকর ডার্ক মার্ক যেন জানিয়ে দেয় বহুদিন চাপা পড়ে থাকা কোনো বিপদ আবার জেগে উঠেছে।
এরপর হগওয়ার্টসে শুরু হয় ট্রাইউইজার্ড টুর্নামেন্ট। তিনটা জাদুবিদ্যার স্কুলের শিক্ষার্থীরা তিনটা অত্যন্ত বিপজ্জনক পরীক্ষায় অংশ নেবে। প্রত্যেক স্কুল থেকে একজন করে চ্যাম্পিয়ন নির্বাচিত হওয়ার কথা। কিন্তু গবলেট অব ফায়ার যখন হ্যারির নামও বেছে নেয় তখন সবাই অবাক হয়ে যায়। হ্যারি তো প্রতিযোগিতার জন্য নিজের নামই দেয়নি। তবু তাকে অংশ নিতে হয়।
ঠিক এই মুহূর্তটাই বইটার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ জীবনের অনেক বড় পরীক্ষায় আমরা নিজেরাই নাম লিখি না। তবু পরিস্থিতি আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তখন প্রশ্ন থাকে না, “আমি কেন?” প্রশ্ন হয়ে যায়, “এখন আমি কী করবো?”
হ্যারির সামনে আসে তিনটা অসম্ভব কঠিন পরীক্ষা। প্রথমে তাকে ড্রাগনের মুখোমুখি হতে হয়। তারপর গভীর হ্রদের নিচে এমন এক পরীক্ষায় নামতে হয় যেখানে তাকে শুধু নিজের না অন্যদের জন্যও ঝুঁকি নিতে হয়। শেষ পরীক্ষায় সে প্রবেশ করে একটি বিশাল গোলকধাঁধায়। যেখানে পথ হারানোর চেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে সত্যের কাছে পৌঁছে যাওয়া।
তবে এই পুরো পরীক্ষা’র মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রতিযোগিতা না। গুরুত্বপূর্ণ হলো হ্যারি কীভাবে বদলে যায়। সে আগের মতো শুধু সেই ছেলে নেই যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। কারণ তার সামনে আর কোনো পথ নেই। এবার তাকে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কখন ঝুঁকি নেবে। কাকে বিশ্বাস করবে। কখন সাহায্য চাইবে। কখন অন্যের জন্য নিজের নিরাপত্তা ত্যাগ করবে।
আর এখানেই গবলেট অব ফায়ার বন্ধুত্বকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়।
রন ও হারমায়োনির সঙ্গে হ্যারির সম্পর্কেও এক ধরনের টানাপোড়েন আসে। ঈর্ষা, ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান, প্রতিযোগিতা। খুব পরিচিত মানবিক অনুভূতি। বন্ধুত্বের মানুষগুলোও সবসময় আমাদের বুঝবে না। কখনো তারা আমাদের নিয়ে গর্বিত হবে। কখনো আমাদের ওপর রাগ করবে। আর কখনো আমাদের সাফল্য তাদের নিজের অক্ষমতার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। তবু সত্যিকারের বন্ধুত্বের সৌন্দর্য এখানেই যে দূরত্ব তৈরি হলেও সম্পর্কের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না।
হারমায়োনি যেমন হ্যারির পাশে থাকে তেমনি রনের সঙ্গে তার বন্ধুত্বও ধীরে ধীরে আবার নিজের জায়গা খুঁজে পায়। যেন গবলেট অব ফায়ার মনে করিয়ে দেয় বন্ধুত্ব মানে কখনোই মতের মিল না। বরং মতের অমিলের পরেও একে অপরের কাছে ফিরে আসার ক্ষমতা।
তবে বইটির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে শেষ পরীক্ষায়।
হ্যারি ও সেড্রিক ডিগরি যখন গোলকধাঁধার শেষ প্রান্তে পৌঁছে ট্রফিটি স্পর্শ করে তখন তারা এমন এক জায়গায় চলে যায় যেখানে টুর্নামেন্টের নিয়ম, প্রতিযোগিতার উত্তেজনা, জয়ের আনন্দ সবকিছু হঠাৎ অর্থহীন হয়ে যায়।
সেখানে ফিরে আসে ভলডেমর্ট। তখন হ্যারি বুঝতে পারে এতোক্ষণ যে প্রতিযোগিতা বলে মনে হচ্ছিল সেটা আসলে ছিল বড় কোনো পরিকল্পনার অংশ।
এই মুহূর্তে গল্পের আবহ একেবারে বদলে যায়। শিশুসুলভ জাদুর জগৎ হঠাৎ খুব বাস্তব হয়ে ওঠে। কারণ মৃত্যু তখন আর দূরের কোনো গল্প না। বন্ধুর মৃত্যু, ভয়ের প্রত্যাবর্তন, একজন পুরোনো শত্রুর পুনর্জন্ম, এবং হ্যারির অসহায়ত্ব সবকিছু একসঙ্গে তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
এই অংশটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়। আমরা প্রায়ই সাহসকে ভয়ের অনুপস্থিতি বলে ভাবি। অথচ হ্যারি আমাদের অন্য কিছু শেখায়। সাহস মানে ভয় না পাওয়া না। ভয়কে সঙ্গে নিয়েই সামনে এগিয়ে যাওয়া।
হ্যারি ভয় পায়। সে কষ্ট পায়। সে বুঝতে পারে না কেন তাকে এসবের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। তবু সে ফিরে আসে। আর ফিরে আসাটাই কখনো কখনো সাহসের সবচেয়ে কঠিন রূপ।
তাই আমার কাছে Goblet of Fire হ্যারি পটারের শুধু আরেকটা অ্যাডভেঞ্চার না। এটা শৈশবের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোরের গল্প। যে ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করছে পৃথিবী সবসময় ন্যায়সঙ্গত হবেনা। ভালো মানুষ সবসময় জেতে না। বন্ধুত্বে সবসময় বোঝাপড়া থাকে না। আর কিছু সত্য এতো এতো কঠিন যে সেগুলো জানার পর আর আগের মানুষ হয়ে থাকা যায় না।
এই বই পড়তে পড়তে আমার মনে হল, বড় হয়ে ওঠা আসলে বয়স বাড়ার নাম না। বড় হয়ে ওঠা মানে পৃথিবীর অন্ধকার সম্পর্কে জেনে যাওয়ার পরও তার ভেতরে আলো খুঁজে যাওয়া।
হ্যারির চারপাশে অন্ধকার যেমন বাড়ছে। তেমনি তার ভেতরের মানবিকতাও বাড়ছে। সে জয় চায় ঠিকই কিন্তু অন্যের জীবন দিয়ে না। সে নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবে ঠিকই তবে প্রয়োজনে অন্যকে বাঁচাতে ঝুঁকি নেয়। সে ভয় পায় ঠিকই তবুও পালিয়ে যায় না।
হয়তো এটাই এই বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর লেসন্স।
জীবন আমাদের সব পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র দেয় না। কখনো গবলেট আমাদের নাম বেছে নেয়। কখনো আমরা এমন গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়ি যার শেষ কোথায় জানি না। কখনো এমন সত্যের মুখোমুখি হই যেটা আমাদের শৈশবের নিশ্চিন্ত পৃথিবীটাকে ভেঙে দেয়।
তবুও আমাদের হাতে একটা জিনিস থাকে। আমাদের চয়েস!
আমরা ভয়ের সামনে কীভাবে দাঁড়াবো, কাকে পাশে রাখবো, আর অন্ধকারের মধ্যেও নিজের মানুষগুলোকে কিভাবে আগলে রাখবো সে সকল সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হয়।
আর সম্ভবত এখানেই Harry Potter and the Goblet of Fire তার জাদুর সবচেয়ে বড় রহস্যটি রেখে যায়।
জাদু সবসময় ছড়িতে থাকে না। কখনো কখনো জাদু হলো ভয় পাওয়ার পরও ফিরে আসা।
হারানোর পরও ভালোবাসতে পারা। আর পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেলেও নিজের ভেতরের আলোটুকুন নিভতে না দেওয়া।


