বুক রিভিউঃ হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য প্রিজনার অব আজকাবান, জে. কে. রাউলিং
ভয়, স্মৃতি, ভুল বিচার ও আত্ম-আবিষ্কারের ভেতর দিয়ে বড় হয়ে ওঠার এক জাদুকরী উপাখ্যান।
প্রত্যেক মানুষের শৈশবের একটি বিশেষ মুহূর্ত থাকে যখন আমরা প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করি যে পৃথিবীটা শুধুই ভালো মানুষের দ্বারা গঠিত। কিন্তু তখনই শিশুর সরল নৈতিক জগৎ ভেঙে যায় যখন শিশুটি জানতে পারে যে পৃথিবীতে ভুল বোঝাবুঝি আছে, অন্যায় আছে, বিশ্বাসঘাতকতা আছে, এবং এমন মানুষও আছে যারা অপরাধী বলে চিহ্নিত হলেও প্রকৃতপক্ষে নির্দোষ। সাদা-কালোর জায়গায় তখন ধূসর রং প্রবেশ করে সকল শিশুর মনে। Harry Potter and the Prisoner of Azkaban ঠিক সেই ধূসর ধারার একটি গল্প।
প্রথম দুটি বইয়ে আমরা জাদুর বিস্ময় দেখি। কিন্তু তৃতীয় বইয়ে আমরা ভয়, স্মৃতি, ভুল বিচার, ক্ষমা ও বড় হয়ে ওঠার গল্প ইত্যাদি দেখি।
জাদুর ভেতরে মানুষের মনস্তত্ত্ব
গল্পের শুরুতেই হ্যারি আবারও ডার্সলিদের বাড়িতে একরকম বন্দি। বাহ্যিকভাবে সে বেঁচে আছে কিন্তু তার জীবন যেন এক ধরনের অদৃশ্য কারাগার। এই বন্দিত্ব কেবল শারীরিক না এটি মানসিকও। এমন এক শিশুর নিঃসঙ্গতা যার পরিবার নেই, যার অতীত কি ছিল তার কোন উত্তর নেই, এবং যার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত।
কিন্তু হগওয়ার্টসে ফিরে গিয়েও হ্যারি নিরাপত্তা খুঁজে পায় না। কারণ একটি নাম তার চারপাশে ঘুরতে থাকে- সিরিয়াস ব্ল্যাক। জাদু জগতের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধীদের একজন বলে পরিচিত এই মানুষটি আজকাবান কারাগার থেকে পালিয়ে এসেছে। সবাই বিশ্বাস করে সে হ্যারিকে হত্যা করতে চায়।
সত্যের মুখ সবসময় প্রথমে দেখা যায় না
এখানেই উপন্যাসটি তার প্রথম বড় প্রশ্নটি তোলে যে “আমরা কি সত্যিই জানি কে অপরাধী?” মানবসভ্যতার ইতিহাসে অসংখ্য মানুষকে সমাজ অপরাধী বলে চিহ্নিত করেছে। পরে জানা যায় সত্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিচার অনেক সময় তথ্যের উপর না ভয়ের উপর দাঁড়ায়। আর ভয় যখন সত্যের জায়গা দখল করে তখন নির্দোষ মানুষও অপরাধীতে পরিণত হয়। সিরিয়াস ব্ল্যাক সেই প্রশ্নেরই প্রতীক।
এই বইয়ের অন্যতম শক্তিশালী সৃষ্টি হলো ডিমেন্টররা। তারা কোনো ড্রাগন না, কোনো দানব না, কোনো অন্ধ জাদুকরও না। তবে তারা মানুষের সবচেয়ে সুখী স্মৃতিগুলো শুষে নেয়। অর্থাৎ ডিমেন্টরদের উপস্থিতিতে মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে খারাপ, ভয়ংকর মুহূর্তগুলো পুনরায় নতুন করে অনুভব করতে শুরু করে।
তবে এ ধারণাটি আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে। কারণ বাস্তব জীবনের বিষণ্নতা অনেকটা এমনই। বিষণ্নতা সবসময় মানুষকে কষ্ট দেয় না বরং সুখ অনুভব করার ক্ষমতাটাই কেড়ে নেয়।
ডিমেন্টরদের মধ্যেও আমি তাই এক ধরণের মানসিক যন্ত্রণার রূপ দেখতে পাই। তারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ অনেক সময় বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে না, নিজের মনের অন্ধকারের সঙ্গে।
হ্যারি যখন ডিমেন্টরের সামনে দাঁড়ায় তখন সে তার মায়ের মৃত্যুর শেষ চিৎকার শুনতে পায়। এই শুনতে পাওয়াটা শুধু একটি স্মৃতি না। এটি একটি ট্রমা। শৈশবের এমন এক ক্ষত, যা কখনও পুরোপুরি সেরে ওঠেনি। এই কারণেই আমার কাছে Prisoner of Azkaban হ্যারি পটার সিরিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বলে মনে হয়েছে। এখানেই প্রথমবারের মতো বুঝতে পারি যে হ্যারির সংগ্রাম কেবল ভলডেমর্টের বিরুদ্ধে না, তার নিজের অতীতের বিরুদ্ধেও।
নতুন চরিত্র হিসেবে আসেন রেমাস লুপিন। সম্ভবত পুরো সিরিজের সবচেয়ে মানবিক শিক্ষকদের একজন। লুপিন শক্তিশালী, জ্ঞানী ও সহানুভূতিশীল। কিন্তু তারও একটি গোপন অভিশাপ আছে। তিনি একজন ওয়্যারউলফ।
এই চরিত্রের মাধ্যমে রাউলিং সমাজের আরেকটি চিরন্তন সমস্যাকে সামনে আনেন যাকে আমরা কলঙ্ক বা স্টিগমা বলি। লুপিন মানুষ হিসেবে খারাপ না। তিনি খারাপ মানুষও হতে চান না। তবুও সমাজ তাকে ভয় পায়, প্রত্যাখ্যান করে, দূরে সরিয়ে রাখে।
আমরা প্রায়ই মানুষের পরিচয়কে তার চরিত্রের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই। কোনো একটি লেবেল, কোনো একটি পরিচয়, কোনো একটি দুর্বলতা দিয়ে আমরা একজন মানুষকে বিচার করি। লুপিন সেই প্রবণতার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। তার চরিত্র আমাদের শেখায় মানুষের মূল্য তার দুর্বলতায় না, তার আচরণে।
বন্ধুত্বও এই বইয়ের অন্যতম প্রধান বিষয়। হ্যারি, রন ও হারমায়োনির সম্পর্ক প্রথমবারের মতো বাস্তব সংঘাতের মুখোমুখি হয়। বন্ধুত্ব মানেই সবসময় একমত হওয়া না। রনের সঙ্গে হারমায়োনির ঝগড়া, ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান সবকিছুর মাধ্যমে বুঝতে পারি যে সত্যিকারের সম্পর্কের ভিত শক্ত হয় মতবিরোধের মধ্য দিয়েই।
শৈশবের গল্পগুলোর একটি সাধারণ দুর্বলতা হলো সেখানে বন্ধুত্বকে নিখুঁত হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু এই বই বন্ধুত্বকে মানবিক করে তোলে। এখানে বন্ধুরা ভুল করে। রাগ করে। ক্ষমা চায়। আবার একসঙ্গে দাঁড়ায়। আর এ কারণেই তাদের সম্পর্ক বাস্তব মনে হয়।
স্মৃতি, ক্ষতি ও ক্ষমার অনুশীলন
তবে সবচেয়ে গভীর মুহূর্তগুলোর একটি আসে প্যাট্রোনাস মন্ত্রের মাধ্যমে। প্যাট্রোনাস তৈরি করতে হলে একজন জাদুকরকে তার সবচেয়ে সুখী স্মৃতির কথা ভাবতে হয়। এ যেন মানবজীবনের এক সুন্দর রূপক। অন্ধকারকে ধ্বংস করার জন্য অন্ধকারের সমান শক্তি দরকার হয় না। অনেক সময় একটি সুখের স্মৃতিই যথেষ্ট। যেমন একটু ভালোবাসা। একটি হাসি। একটি নিরাপদ মুহূর্ত। একজন মানুষ যার কাঁধে কাঁধ রেখে সকল সুখ-দুঃখ অবলীলায় এক্সপ্রেস করা যায়। আমাদের জীবনেও কঠিন সময়ে বেঁচে থাকার শক্তি প্রায়ই আসে অতীতের কোনো সুন্দর স্মৃতি থেকে।
সময়ের কাছে মানুষের চিরন্তন পরাজয়
হারমায়োনির টাইম-টার্নার প্রথমে আমার কাছে শুধুই একটি জাদুবস্তু বলে মনে হয়েছে। কিন্তু যতোই গল্প এগিয়েছে ততোই মনে হয়েছে এটি আসলে আমাদের সবার এক নীরব ইচ্ছার প্রতীক। কতোবার যে ভেবেছি যদি জীবনের নির্দিষ্ট কিছু মুহূর্তে ফিরে যেতে পারতাম!! হয়তো কিছু কথা নতুন করে বলতাম, কিছু ভুল এড়িয়ে যেতাম। কিন্তু এই বই আমাকে বুঝিয়েছে জীবনের কিছু ক্ষত মুছে ফেলার জন্য না। কারণ এসব ক্ষত বা অপূর্ণতাই আমাদের নতুন মানুষ করে গড়ে তোলে।
নিজেকেই একদিন নিজের আলো হতে হয়
হ্যারি’র বিশ্বাস ছিল যে তার বাবাই তাকে ডিমেন্টরদের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। কিন্তু পরে যখন আবিষ্কার করে যে তাকে যে বাঁচিয়েছে মানুষটি আসলে অন্য কেউ না বরং হ্যারি নিজেই। তখন আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা আর সাহস একসঙ্গে জন্ম নিয়েছে। কারণ আমিও একসময় ভাবতাম কেউ একজন এসে হয়তো আমাকে কঠিন সময় থেকে উদ্ধার করবে, জীবনের কিছু আন্সারটেইন সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। কিন্তু বড় হতে হতে বুঝেছি জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তে নিজের হাতটাই নিজেকে সবচেয়ে বেশি শক্ত করে ধরতে হয়।
সিরিয়াস ব্ল্যাকের সত্য জানার পর মনে হয়েছে আমরা কত সহজে মানুষকে বিচার করে ফেলি। অথচ তার গল্পটা জানার ধৈর্য রাখি না। এটুকুন উপলব্ধি একজনের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে পারাটাই এই বইয়ের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য মনে হয়েছে আমার কাছে।
অন্ধকারের ভেতরেও আলো বেঁচে থাকে
সবশেষে বলবো Harry Potter and the Prisoner of Azkaban শুধু একটি ফ্যান্টাসি উপন্যাস না। এটি মনে করিয়ে দেয় পৃথিবী সব সময় ন্যায়সঙ্গত হবে না, মানুষ সব সময় সত্য বলবে না, আর অন্ধকার কখনো পুরোপুরি চলে যাবে না। তবে নিজের ভেতরের আলোটুকু যদি বাঁচিয়ে রাখা যায় তাহলে সেই অন্ধকারও একদিন পথ ছেড়ে দেয়।


