বুক রিভিউঃ হাঁটি হাঁটি পা পা, ফিরোজা বহ্নি
সন্তান জন্ম দেওয়া মানে শুধু একটি প্রাণকে পৃথিবীতে আনা না। এই মুহূর্তে আসলে দুটি মানুষ জন্ম নেয়। একটি শিশু, আর একজন মা। শিশুটির জন্মের কথা সবাই জানে, সবাই উদযাপন করে। কিন্তু মায়ের এই দ্বিতীয় জন্মটি প্রায়ই নীরবে ঘটে। যেখানে কোনো আলো নেই, যেখানে কোনো ফুল নেই, যার জন্য কোনো করতালি নেই। শুধু আছে একটি ছোট্ট প্রাণের ভার, আর বুকের ভেতর থেকে জেগে ওঠা এক অচেনা, অসীম ভালোবাসা। যার জন্য পৃথিবীর কোনো ভাষায় এখনো পুরোপুরি সঠিক শব্দ তৈরি হয়নি।
দার্শনিক সিমন দ্য বোভোয়ার সারাজীবন লিখেছিলেন নারী’র “হয়ে ওঠার” কথা। তার মতে নারী জন্মায় না, তৈরি হয়। সেই হয়ে ওঠার সবচেয়ে নিবিড় ও নীরব অধ্যায় শুরু হয় মাতৃত্বের প্রথম রাতেই, যখন হাসপাতাল থেকে ফেরা একজন নারী তার কোলের শিশুটির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে যে কোনো বই, কোনো তত্ত্ব, কোনো পরামর্শ তাকে এই মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত করতে পারেনি। তখন পাশে থাকে শুধু শিশুর মৃদু নিঃশ্বাস, চারপাশের নীরবতা, আর নিজের ভেতর থেকে উঠে আসা এক অজানা-অচেনা সাহস। ফিরোজা বহ্নির হাঁটি হাঁটি পা পা সেই হয়ে ওঠার, সেই নীরব জন্মের গল্প।
প্রবাসের নদী ও একা সাঁতারু
বইয়ের পরিসর ছোট ঘরের, কিন্তু অনুভূতির পরিসর মহাসমুদ্রের। আমার কাছে সুদূর প্রবাসে আত্মীয়-স্বজনহীন পরিবেশে সম্পূর্ণ একা একটা বাচ্চার দায়িত্ব নিয়ে নিজেকে একটু একটু করে বদলে ফেলার মতো এই অভিজ্ঞতা শুধু একজন মায়ের ডায়েরি বলে মনে হয়নি, বরং অনেকটা একজন মানুষের একাকী সমুদ্রে সাঁতার শেখার আখ্যান। যার মাধ্যমে লেখিকা নিজের সুখ-দুঃখ, ভালো লাগা, মন্দ লাগা সর্বোপরি নিজেকেই উদার করে তুলে ধরেছেন অবচেতন মনে।
প্রবাসের দেয়ালগুলো নিঃশব্দ থাকে। সেই নিঃশব্দতার ভেতর একটি শিশুর প্রথম হাসি, প্রথম কান্না, প্রথম শব্দ এগুলো কোনো সাক্ষী ছাড়াই ঘটে যায়। ফিরোজা বহ্নি সেই সাক্ষীহীন মুহূর্তগুলোকে কাগজে ধরে রেখেছেন। ভবিষ্যতের জন্য। যে ভবিষ্যতে তার মেয়ে বর্ণমালা একদিন পড়বে ও বুঝবে যে প্রতিটি শিশুর আগমনের সাথে সাথে একজন মায়েরও নীরব যুদ্ধ শুরু হয়। তবে সেই যুদ্ধে কোনো পদকপ্রথা নেই।
ঘড়ির কাঁটা ও মানবশিশু
একটু এক্টু করে বেড়ে ওঠে সন্তান আর সঙ্গে বেড়ে ওঠে তার মা। হাজারও অনিশ্চয়তা, অপার আনন্দ আর অদ্ভুত মায়ায় ঘেরা অজানা পথ বেয়ে দুজন হেঁটে যায় একসঙ্গে। এই চলার পথটা গভীর। মা ও সন্তান কেউই পথ চেনে না, দুজনেই শিক্ষার্থী, দুজনেই অগোছালো, দুজনেই অসম্পূর্ণ। সেই অসম্পূর্ণতার মধ্যেই রয়েছে জীবনের সবচেয়ে খাঁটি সৌন্দর্য।
শিশু শেখে হাঁটতে। বারবার পড়ে যায়। কিন্তু প্রতিটি পতনের পর উঠে দাঁড়ানোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে এক বিশাল মহাজাগতিক সত্য- যে জীবন কখনো সরলরেখায় চলে না, যে জীবন পড়তে পড়তেই হাঁটতে শেখে।
প্রযুক্তির মরীচিকা ও মায়ের আলো
এই যুগে একটি শিশুকে স্ক্রিনের আলো থেকে দূরে রেখে প্রকৃতির আলোয় বড় করা একটা বড়সড় বিপ্লব। লেখিকার ভাষায় “টিভি থেকে পোলাপানকে দূরে রাখতে হলে মাতার নিজেরই টিভি হতে হবে” এই যে উপলব্দি এটা আপাতদৃষ্টিতে রসাত্মক শোনালেও অত্যন্ত গভীর একটা চিন্তা বর্তমান সময়ের প্যারেন্টসদের জন্য। কারণ মা হলেন সেই জীবন্ত আলো যাকে পর্দার কৃত্রিম আলো প্রতিস্থাপন করতে পারে না। কিন্তু সেই আলো জ্বালিয়ে রাখতে কত যে জ্বালানি পোড়ে তা কেবল মায়েরাই জানেন।
কারণ একটি শিশুকে বড় করে তোলা মানে তাকে শুধু খাওয়ানো বা যত্ন নেওয়ার বিষয় না বরং তার ছোট্ট অবুঝ মনটির সঙ্গে একরকম অদৃশ্য সেতু নির্মাণের শিল্পের মতো। শিশুদের মন ঠিক নরম কাদামাটির মতো। ভালোবাসা, ধৈর্য ও উপস্থিতির স্পর্শে যাকে আপনি ধীরে ধীরে আকার দিতে পারবেন। সেই আকার দেওয়ার পথে লেখিকার অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও নিজস্বভাবে আবিষ্কৃত নানা কৌশল বইটিকে করেছে অনন্য।
বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে মাতৃত্ব নিজেই এক ধরনের গভীর শিক্ষা। একজন সচেতন মায়ের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা অনেক সময় তত্ত্বের চেয়েও বেশি সত্য ও জীবন্ত হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে ভালো লেগেছে লেখিকার সততা। তিনি দেখিয়েছেন একজন মা কীভাবে নিজের ক্লান্তি, হতাশা, মান-অভিমান আর ব্যক্তিগত অস্থিরতাকে আড়ালে রেখে সন্তানের জন্য একটি আনন্দময় পৃথিবী গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু সে পৃথিবী নিখুঁত না, তবে ভালোবাসায় পূর্ণ।
প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে শিশুকে স্ক্রিনের মোহ থেকে দূরে রাখা যেন স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটার মতো কঠিন। ফিরোজা বহ্নি সেই কঠিন পথটিই বেছে নিয়েছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, শিশুর সবচেয়ে বড় বিনোদন কোনো পর্দা না বরং একজন উপস্থিত মা, একটি গল্প, একটি গান, কিংবা একসঙ্গে কাটানো কিছু মনোযোগী সময়।
পোস্টপার্টাম বিষণ্নতাঃ এক অদৃশ্য সমুদ্র
একটি বাচ্চা’র জন্মের পর আশেপাশে সবাই রীতিমতো উৎসব করে। পরিবার-পরিজন’দের কাছ থেকে ফুল আসে, মিষ্টি আসে, শুভেচ্ছা আসে। কিন্তু যে মানুষটি সেই বাচ্চাকে নয় মাস বহন করেছে, যার শরীর সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে তিনি প্রায়ই একা বসে থাকেন এক অদ্ভুত অন্ধকারে। বাইরে উৎসব, ভেতরে ঝড়। যেন সবকিছু এখনই ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। তবে এই ঝড়ের একটা নাম আছে- পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন। কিন্তু আমাদের সমাজে এই নামটি উচ্চারণ করার আগেই গলা চেপে ধরা হয়।
প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা কোনো দুর্বলতা না, কোনো অকৃতজ্ঞতা না, কোনো “মন খারাপের” সাধারণ ঢেউ না। এটি একটি নিউরোবায়োলজিক্যাল বাস্তবতা। সন্তান জন্মের পর শরীরে হরমোনের যে হঠাৎ পতন ঘটে, তা মস্তিষ্কের রসায়নকে এমনভাবে বদলে দেয় যে মা নিজেই নিজেকে চিনতে পারেন না। তিনি ভালোবাসেন তার বাচ্চাকে ঠিকই কিন্তু একই সঙ্গে ডুবে যান এক অথৈ শূন্যতায়। এরকম দুটো অনুভূতি যে একসাথে থাকতে পারে এই সত্যটি স্বীকার করার সাহস আমাদের সমাজ এখনো পুরোপুরি অর্জন করেনি।
তবে ফিরোজা বহ্নি সেই সাহসটুকু দেখিয়েছেন। তিনি লিখেছেন তার ক্লান্তির কথা। শুধু শরীরের ক্লান্তি না, মনের ক্লান্তি-আত্মার ক্লান্তি। সেই রাতগুলোর কথা যখন বাচ্চা কান্না করছে অনবরত, শরীর আর কুলাচ্ছে না, মন বিদ্রোহ করছে। আর চারপাশে বলার মতো কেউ ছিলোনা যে, “তুমি ঠিক আছো?” যে সমাজে একজন নতুন মাকে সবসময় হাসি-খুশি থাকতে হবে, সুখী না হলেও সুখে আছি’র ভান করতে হবে, এবং সব ধরণের মনস্তাত্ত্বিক জুলুমের পরেও কৃতজ্ঞ থাকতে হবে সেই সমাজে “আমি ভালো নেই” বলাটা একটা রীতিমতো বিপ্লব।
আর এই বিপ্লবের কথা যখন কেউ কাগজে লেখেন তখন সেটি শুধু একটি স্বীকারোক্তি থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে একটি প্রদীপ। যে প্রদীপের আলোয় অন্য আরেকজন মা হয়তো এই মুহূর্তে একা কোনো ঘরে বসে আছেন। যিনি আসলে বুঝতে পারছেন না তিনি কেন কাঁদছেন তবে অনুভব করতে পারেন, দেখতে পান যে এই যাত্রায় তিনি একা নন।
যে যাত্রার কোনো গন্তব্য নেই
হাঁটি হাঁটি পা পা আসলে একটি রূপকথা। যেখানে রাজকুমারী একটি শিশু আর ড্রাগনটি হলো অনিশ্চয়তা। কিন্তু এই রূপকথায় তরবারি নেই। আছে কেবল ধৈর্য, ভালোবাসা, ও প্রতিদিনের ছোট ছোট করে হাঁটার সাহস।
প্রতিটি মানবজীবন আসলে একটি হাঁটি হাঁটি পা পা দিয়েই শুরু হয়। শিশু প্রথমে হাঁটতে শেখে, তারপর মা। তারপর আমরা সবাই। বারবার পরে যায়, বারবার উঠে দাঁড়ায়। ফিরোজা বহ্নি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে বড় হওয়া কখনো শেষ হয় না। প্রতিটি নতুন ভোর আমাদের আবার শিশু বানায় এবং সেটাই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সত্য।


