ধরো, রাত অনেক হয়েছে। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। তুমি একা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছো। ফ্রিজের হালকা শব্দ ছাড়া চারপাশে কোনো শব্দ নেই। অথচ এই নীরব রান্নাঘরটিই হঠাৎ তোমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা মনে হচ্ছে। তুমি নিশ্চিতভাবে জানো না কেন। হতে পারে রান্নাঘরের জীবন খুব সাধারণভাবে চলতে থাকে। ভাত রান্না হয়। সবজি কাটা হয়। মাছ কাটা হয়। ক্ষুধা লাগে। মানুষ খায়। আর সেই খাওয়ার মধ্যেই অদ্ভুতভাবে মানুষ আবার বেঁচে থাকার দিকে একটু একটু করে ফিরে আসে।
Banana Yoshimoto-র Kitchen পড়তে পড়তে আমার বারবার এই রান্নাঘরের কথাই মনে হয়েছে।
যদিও কিচেন অনেক ছোট একটা বই। কিন্তু এর ভেতরের শূন্যতা অনেক অনেক গুণ বড়।
ব্যস্ত শহরে অসংখ্য মানুষের মতো মিকাগে সাকুরাইও একা। খুব অল্প বয়সেই সে তার আপনজনদের হারাতে হারাতে এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়ায় যেখানে নিজের অস্তিত্বটাকেই অনেক ভারী মনে হয়। তার জীবনে রান্নাঘর একটি বিশেষ আশ্রয়। রান্নাঘরে সে কাজ করে, খাওয়া দাওয়া করে। অনেক সময় ঘুমায় ও। কারণ রান্নাঘরের টুকটাক শব্দ তাকে মনে করিয়ে দেয় পৃথিবী এখনো চলছে।
অন্যদিকে আসে ইউইচি তানাবে ও তার মা এরিকো। মিকাগের জীবনে তারা এক অদ্ভুত উষ্ণতা নিয়ে প্রবেশ করে। কিন্তু এই উষ্ণতার ভেতরেও আছে হারানোর ছায়া।
আমরা সাধারণত ভাবি শোক মানে কান্না করা, মন খারাপ করে থাকা, সুখ দুঃখের কিছু স্মৃতি আর নিঃসঙ্গ একটি ঘর। কিন্তু শোক আসলে এর চেয়েও বেশি কিছু। শোক হলো একই পৃথিবীতে থেকেও হঠাৎ পৃথিবীটাকে অন্যরকম দেখতে শুরু করা।
যে চেয়ারটিতে একজন মানুষ প্রতিদিন বসতেন, সেটা হঠাৎ খালি হয়ে যাওয়া। যে কাপ-প্লেট-গ্লাস এ মানুষটা খাবার সারতেন সেসব আর শুধু ম্যাটেরিয়াল জিনিসে সীমাবদ্ধ না থাকা। যে সময়টায় নিয়ম করে ফোন আসতো সেই সময়টা হঠাৎ খুব দীর্ঘ হয়ে যাওয়া। তুমি জানো যে ফোন কল’টা আর আসবে না। তবু অজান্তেই ফোনের দিকে তাকাও।
মানুষ চলে যায়। কিন্তু তার অনুপস্থিতি থেকে যায়। আর Kitchen সেই থেকে যাওয়া অনুপস্থিতিরই গল্প।
আমাদের জীবনের কিছু কিছু দুঃখ বড় কোনো ঘটনা থেকে আসে না। কখনো তা আসে সকালের নাশতা বানাতে গিয়ে। কখনো বাজার থেকে ফেরার পথে। কখনো পরিচিত একটি গন্ধে। কখনো এমন একটি খাবারের সামনে বসে যেটা একসময় প্রিয় একজন মানুষের সঙ্গে খেয়েছিলাম।
খাবার এখানে শুধু খাবার না। রান্নাঘরও শুধু রান্নাঘর না। এগুলো হয়ে ওঠে মানুষের বেঁচে থাকার ভাষা।
আমরা যখন কাউকে ভালোবাসি তাকে সবসময় বড় বড় কথা বলে ভালোবাসি না। কখনো তার জন্য এক কাপ চা বানাই। তার পছন্দের খাবার রান্না করি। অসুস্থ হলে জিজ্ঞেস করি “কিছু খাবে?” এই ছোট্ট প্রশ্নটা’র মধ্যে কতোখানি ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে আমরা হয়তো তখন বুঝতেই পারি না।
Yoshimoto সেই সাধারণ কাজগুলোর মধ্যেই মানুষের কোমলতাকে খুঁজে পান।
মিকাগের সঙ্গে ইউইচির সম্পর্কও তাই প্রচলিত অর্থে শুধু প্রেমের গল্প না। দুজন আহত মানুষের একে অপরের কাছে এসে দাঁড়ানোর গল্প। দুজন মানুষ যারা জানে হারানো কাকে বলে। যারা জানে ভালোবাসা মানেই কাউকে চিরকাল ধরে রাখা না। ভালোবাসা মানে একজন মানুষের পাশে বসে তার দুঃখটাকে একটু জায়গা দেওয়া।
কাউকে হারানোর পর আমরা কীভাবে আবার নিজেদের জীবনের দিকে ফিরি?
এর কোনো সহজ উত্তর নেই।
সময় সব ক্ষত সারিয়ে দেয় কথাটা খুব সুন্দর শোনায়। কিন্তু সবসময় সত্যি না। কিছু ক্ষত সারিয়ে ওঠে না। আমরা বরং সেই ক্ষত নিয়ে বাঁচতে শিখি। দুঃখ আমাদের শরীরের কোথাও একটি অতিরিক্ত অঙ্গের মতো থেকে যায়। প্রথমে সেই দুঃখকে নিয়ে হাঁটা কঠিন হয়। পরে আমরা তার ওজনের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাই।
Kitchen আমাকে মনে করিয়ে দেয় সুস্থ হয়ে ওঠা মানে অতীতকে ভুলে যাওয়া না। বরং তার সঙ্গে একটি নতুন সম্পর্ক তৈরি করা।
মিকাগে রান্নাঘরের দিকে ফিরে যায়। খাবারের দিকে ফিরে যায়। মানুষের দিকে ফিরে যায়। জীবনের ছোট ছোট আনন্দের দিকে ফিরে যায়। যেন সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারে মৃত মানুষদের আমরা ফিরিয়ে আনতে পারি না। কিন্তু তাদের ভালোবাসার ভেতর থেকে আমাদের জীবনের জন্য কিছু আলো তুলে নিতে পারি।
আর হয়তো বেঁচে থাকার অর্থও সেটাই।
যারা চলে গেছে তাদের আমরা ধরে রাখতে পারি না। কিন্তু তারা আমাদের মধ্যে যে মানুষটিকে তৈরি করে গেছে তাকে ধরে রাখতে পারি।
এই বই পড়তে পড়তে রান্নাঘরটাকে আমার কাছে তাই এক ধরনের প্রতীকের মতো মনে হয়েছে। রান্নাঘর এমন একটা জায়গা যেখানে কাঁচা জিনিস ধীরে ধীরে রান্না হয়। কঠিন শক্ত খাবার নরম হয়। আলাদা আলাদা উপাদান একসঙ্গে এসে একটা খাবারে পরিণত হয়।
মানুষের জীবনও কি এমন না?
দুঃখ আসে। একাকীত্ব আসে। মৃত্যু আসে। ভালোবাসা আসে। আমরা ভেঙে যাই। আবার জোড়া লাগি। আগের মানুষটি আর থাকি না। কিন্তু ধীরে ধীরে নতুন একটি মানুষ হয়ে উঠি।
Kitchen শেষ করার পর মনে হয়েছে জীবনের সবচেয়ে কোমল আশ্বাসগুলো হয়তো খুব সাধারণ জায়গাতেই লুকিয়ে থাকে। একটা রান্নাঘরে। একটু গরম খাবারে। কারও পাশে চুপচাপ বসে থাকায়। অথবা এমন একজন মানুষের উপস্থিতিতে যে তোমার দুঃখ ঠিক করে দিতে পারে না ঠিকই কিন্তু তোমাকে একা দুঃখ পেতে দেয় না।
জীবন আমাদের কাছে প্রতিশ্রুতি দেয় না যে আমরা আর কাউকে হারাবো না। কিন্তু জীবন মাঝে মাঝে একটা রান্নাঘরের দরজা খুলে দেয় আর বলে, এসো। কিছু খাও। তারপর আবার বেঁচে থাকার চেষ্টা করো।
হয়তো এটাই Kitchen-এর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
এটা শোকের বই। কিন্তু শুধু শোকের না। এটা ভালোবাসার বই। একাকীত্বের বই। মানুষের একে অপরের জন্য আশ্রয় হয়ে ওঠার বই। আর শেষ পর্যন্ত এটা জীবনের বই। কারণ মানুষ যতোবারই হারিয়ে যাক তার ভেতরে কোথাও না কোথাও বেঁচে থাকার একটি ক্ষীণ আলো থেকে যায়। কখনো সেই আলো খুব ছোট। একটা রান্নাঘরের বাতির মতো। কিন্তু অন্ধকারে ছোট এক টুকরো আলোও তো আলো!


