অনেক সময় বইয়ের গল্প শেষ হলেও সে গল্পের রেশ থেকে যায়।, চরিত্রগুলো যেন পরিচিত মানুষ হয়ে মনের ভেতর জায়গা করে নেয়। Little Women আমার কাছে তেমনই একটা বই। Louisa May Alcott-এর এই উপন্যাসে খুব বড় কোনো ঘটনা নেই। নেই এমন কোনো রহস্য যা সমাধানের জন্য পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টাতে হবে দ্রুত। আছে শুধু চার বোনের ছোট্ট একটা পরিবার। তাদের হাসি-কান্না, ঝগড়া, স্বপ্ন, ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান, ভালোবাসা আর ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠার গল্প। কিন্তু এই সাধারণ জীবনটুকুর মধ্যেই অ্যালকট এমন কিছু রেখে গেছেন যা এক শতাব্দীর বেশি সময় পরেও আমাদের নিজেদের জীবনের দিকে তাকাতে বাধ্য করে।
গল্পের কেন্দ্র মার্চ পরিবারের চার বোন- মেঘ, জো, বেথ আর এমি। তারা চারজনই একই বাবা-মায়ের সন্তান, একই বাড়িতে বড় হচ্ছে, অথচ তাদের প্রত্যেকের পৃথিবী আলাদা। মেঘ সুন্দর, সংসারী এবং স্থির জীবনের প্রতি আকৃষ্ট। অন্যদিকে জো অস্থির, স্বাধীনচেতা, লেখক হতে চায় আর প্রচলিত মেয়েদের জীবনের ছকে নিজেকে আটকে রাখতে চায় না। বেথ শান্ত, কোমল আর সঙ্গীতপ্রিয়। অন্যদিকে এমি শিল্পী হতে চায়। নিজের সৌন্দর্য ও সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন। অনেক বেশি এম্বিশাস।
তবে তাদের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো কেউই একে অপরের মতো না। প্রত্যকেই আলাদা আলাদা সত্ত্বা। তাই বইটা তাদের কখনো এক ছাঁচে ফেলতেও চায় নি।
আমাদের ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের নিয়ে কিছু নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করা হয়। ভালো মেয়ে কেমন হবে, কীভাবে কথা বলবে, কী চাইবে, কী চাইবে না, কখন নরম করে কথা বলবে, কখন চুপ থাকবে। Little Women সে জায়গায় এসে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে- একজন মেয়ের কি একটামাত্র সঠিকভাবে বেঁচে থাকার পদ্ধতি আছে?
জো-কে দিয়ে এই প্রশ্নটা সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে আসে। জো লেখক হতে চায়। সে নিজের রাগ, এম্বিশন, স্বাধীনচেতা মনোভাব লুকিয়ে রাখে না। এমনকি সে নিজের মেয়েলি পরিচয়ের সঙ্গেও কখনো কখনো অস্বস্তিতে পড়ে। তার কাছে পৃথিবী যেন বড়। আর সে পৃথিবীর ভেতর জো তার নিজের জন্য একটু বেশি জায়গা চায়। জো-কে ভালো লাগার একটা কারণ হলো সে নিখুঁত না। তার মন- মেজাজ খারাপ হয়, সে রেগে যায়, ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, নিজের অহংকারের সঙ্গে লড়াই করে। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সে নিজের ভেতরের সত্যিটাকে অস্বীকার করতে চায় না। জো-র বড় হয়ে ওঠার গল্প তাই শুধু একজন লেখকের গল্প না। এটা নিজের জন্য একটা জীবন বেছে নেওয়ার গল্প।
অন্যদিকে মেঘ-এর গল্পটা একেবারে অন্য রকম। সে খুব বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখে না। তার চাওয়ার মধ্যে রয়েছে সুন্দর একটা সংসার, একজন ভালোবাসার মানুষ, আর নিজের জন্য একটা ঘর। আজকের চোখে হয়তো মনে হতে পারে মেঘ কেন এতো সহজ একটা জীবন চায়? কিন্তু লিটল উইমেন এর সৌন্দর্য এখানেই যে,অ্যালকট মেঘ-এর স্বপ্নকে জো-এর স্বপ্নের চেয়ে ছোট করে দেখেন না। একজন নারী যেমন লেখক হতে চাইতে পারে। আবার অন্য একজন নারী শুধু মাত্র স্ত্রী ও মা হয়ে একটা পরিবার গড়ে তুলতে চাইতে পারে। দুটো পথই নিজের জায়গায় অর্থপূর্ণ যদি তা নিজের ইচ্ছায় বেছে নেওয়া হয়।
এখানেই Little Women আমার কাছে শুধু নারীদের নিয়ে লেখা একটা পুরোনো উপন্যাস হয়ে থাকে না। এটা চয়েস-এর গল্প হয়ে ওঠে। তুমি কেমন জীবন চাও সেই প্রশ্নের উত্তর অন্য কেউ তোমার হয়ে ঠিক করে দিতে পারে না।
বেথ-এর চরিত্রটা আবার পুরো গল্পে এক ধরনের মৃদু আলো তৈরি করে। সে খুব বেশি কিছু চায় না। তার পৃথিবী ছোট। কিন্তু সেই ছোট পৃথিবীর মানুষগুলোর প্রতি তার ভালোবাসা অসীম। বেথ আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের মূল্য সবসময় বড় কিছু অর্জনের মধ্যে থাকে না। কখনো কখনো প্রয়োজনের সময় কারো পাশে থাকা, কারো মন ভালো করা, চার দেওয়ালের একটা ঘরকে একটু উষ্ণ করে রাখা, কিংবা কাউকে নিঃশব্দে ভালোবাসতে পারাও একটা পূর্ণ জীবন।
তবে বেথ আমার মনে গেঁথে আছে শুধুমাত্র তার কোমলতার জন্য না বরং সেই কোমলতার ভেতরের শক্তির অদম্য জন্য। আমরা প্রায়ই ভাবি শক্ত মানুষ মানেই কঠিন, গম্ভীর মানুষ। Little Women আমার সে ধারণাকে এক্টু ভিন্ন করে বুঝিয়ে দেয়। কোমল মনের মানুষও ভীষণ শক্তিশালী হতে পারে।
আর এমি। প্রথমদিকে তাকে হয়তো সবচেয়ে সহজে অপছন্দ করা যায়। কারণ সে একটু অহংকারী। নিজের সৌন্দর্য নিয়ে সচেতন। সামাজিক মর্যাদা নিয়ে ভাবে। কখনো কখনো স্বার্থপর আচরণও করে বসে। কিন্তু এমি-র চরিত্র সময়ের সঙ্গে বদলায়। সে বড় হয়। তার এম্বিশনগুলো আরও পরিণত হয়। সে বুঝতে শেখে যে শুধু সুন্দর কিছু চাওয়া আর তার জন্য নিজেকে তৈরি করা এক জিনিস না।
এই চার বোনকে একসঙ্গে দেখলে সবচেয়ে সুন্দর যে জিনিসটা চোখে পড়ে তা হলো তাদের পার্থক্য। তারা একে অপরের সঙ্গে ঝগড়া করে, ঈর্ষা করে, অভিমান করে, আবার একে অপরের জন্য নিজের স্বার্থ ছাড়তেও শেখে। পরিবার এখানে কোনো নিখুঁত জায়গা না। বরং এমন একটা জায়গা যেখানে মানুষ নিজের সবচেয়ে ভালো ও সবচেয়ে খারাপ দুই দিকই দেখাতে পারে।
মার্চ পরিবারের আর্থিক সংকটও গল্পের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা খুব স্বচ্ছল না। বড়দিনে উপহার নেই। খাবার নিয়ে হিসাব করতে হয়। বাবা পরিবার থেকে দূরে থাকেন। তবু তাদের ঘরে এমন এক ধরনের উষ্ণতা আছে যা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না। মা মারমি তাদের জীবনের নৈতিক কেন্দ্র। তিনি মেয়েদের শুধু ভালো হতে বলেন না, তিনি তাদের নিজেদের দুর্বলতাকে চিনতে শেখান।
বিশেষ করে মেয়েদের রাগ, অহংকার, ঈর্ষা ও এম্বিশনের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হয় সে বিষয়ে মারমি-র শিক্ষা বইয়ের গল্পকে আরও গভীর করে। কারণ তিনি মেয়েদের এমন হতে বলেন না যে তাদের কোনো রাগ থাকবে না, কোনো ভুল হবে না। বরং নিজের ভেতরের অন্ধকারটুকু চিনে সেটাকে সামলাতে শেখান।
আমার কাছে লিটল উইমেনের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর এক্টা হলো আমাদের বড় হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া। এখানে বড় হওয়া মানে শুধু বয়স বাড়া না। বড় হওয়া মানে নিজের দুর্বলতাকে চিনতে শেখা। নিজের ভুলের দায়ভার নিতে শেখা। অন্যের জীবনকে নিজের জীবনের মাপকাঠি না বানানো। ভালোবাসার অর্থ বোঝা। আর সবচেয়ে কঠিন বিষয়টা হল নিজের স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে একটা সৎ সম্পর্ক তৈরি করা।
জো-র ক্ষেত্রে এই বড় হয়ে ওঠা সবচেয়ে স্পষ্ট। সে বুঝতে শেখে যে স্বাধীনতা মানে শুধু নিজের ইচ্ছেমতো চলা না। স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও আছে। ভালোবাসা মানে নিজের সত্তাকে হারিয়ে ফেলা না। আবার ভালোবাসার জন্য অন্য মানুষকে একেবারে অস্বীকার করাও না। এজন্যেই লিটল উইমেন আমার কাছে এতো আধুনিক মনে হয়েছে। কারণ আমরা এখনো নিজেদের জীবনে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হই। আমি কি আমার নিজের মতো করে বাঁচছি? আমি কি অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের কোনো অংশ হারিয়ে ফেলছি? পরিবারকে ভালোবাসা আর নিজের স্বপ্নকে ভালোবাসা এ দুয়ের মধ্য থেকে আমাকে কি একটা বেছে নিতে হবে?
Little Women এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেয় না। বরং চার বোনের চারটা জীবন দেখিয়ে বলে উত্তর সবার জন্য এক না। আর হয়তো এ কারণেই বইটির নাম Little Women হলেও গল্পটা আসলে ছোট মেয়েদের নিয়ে না। এটা সে মুহূর্তগুলোর গল্প যখন একটা মেয়ে ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে পৃথিবী তাকে যে পরিচয় দিয়েছে তার বাইরেও তার একটা নিজস্ব পরিচয় আছে।
তবে বইটার সৌন্দর্য শুধু বড় হয়ে ওঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ না। এর সবচেয়ে গভীর জায়গাটা সম্ভবত পরিবার। জীবনের অনেক বছর পরেও আমরা যে মানুষগুলোর কাছে ফিরে যেতে চাই তারা সবসময় আমাদের কাছে সবচেয়ে নিখুঁত মানুষ না। তারা সেই মানুষ যাদের সঙ্গে আমরা নিজেদের সবচেয়ে সত্যিকারের রূপে থাকতে পারি। মার্চ বোনদের সম্পর্ক তাই লিটল উইমেন এর হৃদয়। তারা একে অপরকে সবসময় বুঝতে পারে না ঠিকই। কিন্তু তারা একে অপরকে ছেড়ে যায় না কখনো।
হয়তো বড় হয়ে ওঠার সবচেয়ে কঠিন সত্য এটাই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আলাদা হয়ে যাই। আমাদের স্বপ্ন আলাদা হয়, সম্পর্ক বদলায়, শহর বদলায়, জীবন বদলায়। কিন্তু কিছু মানুষ আমাদের ভেতরে এমনভাবে থেকে যায় যে দূরত্ব তাদের মুছে দিতে পারে না।
Little Women পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে হয়েছে বড় হওয়া আসলে শৈশবকে পেছনে ফেলে চলে যাওয়া না। বরং শৈশবের কিছু মানুষ, কিছু শিক্ষা, কিছু ভালোবাসা নিজের সঙ্গে নিয়ে নতুন জীবনের দিকে হাঁটা। আর হয়তো এই কারণেই এতো বছর পরেও মার্চ পরিবারের গল্প পুরোনো লাগে না। কারণ আমাদের প্রত্যেকের ভেতরেই একটু মেঘ আছে। যে এক্টু ভালোবাসা আর একটা আপন ঘর চায়। একটু জো আছে। যে নিজের মতো করে বাঁচতে চায়। একটু বেথ আছে। যে নীরবে ভালোবাসে। আর একটু এমি-ও আছে। যে সুন্দর একটা জীবনের স্বপ্ন দেখে এবং সেই স্বপ্নের যোগ্য হয়ে উঠতে শেখে।
শেষ পর্যন্ত Little Women আমাকে কোনো আদর্শ নারী হওয়ার শিক্ষা দেয়নি। বরং নিজের মতো একজন মানুষ হয়ে ওঠার কথা বলেছে। এমন একজন মানুষ যে ভালোবাসতে পারে কিন্তু নিজেকে হারায় না। স্বপ্ন দেখতে পারে কিন্তু বাস্তবতা ভুলে যায় না। ভুল করতে পারে এবং সেই ভুল থেকে ফিরে আসতেও শেখে।
হয়তো বড় হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা এটাই- তুমি আর আগের মানুষটা নেই, কিন্তু আগের মানুষটাকেও পুরোপুরি হারিয়ে ফেলোনি। তুমি শুধু একটু একটু করে নিজের কাছে ফিরে এসেছো। আর সেই ফিরে আসার গল্পটাই আমার কাছে Little Women।


