আমরা যাকে ভালোবাসা বলি তার ভেতরে ঠিক কতোটা হিসেব লুকিয়ে থাকে? এই প্রশ্নটা করতে আমাদের বুক কাঁপে, ভয় হয়। কারণ উত্তরটা আমরা আসলে জানি, শুধু স্বীকার করি না। মা-বাবা, ভাই-বোন, ঘরের মানুষ এদের ভালোবাসাকে আমরা ধরে নিই নিঃশর্ত, প্রশ্নাতীত, চিরকালীন। অথচ সে ভালোবাসার নিচে প্রায়ই একটা অলিখিত চুক্তি চাপা পড়ে থাকে। যা কেউ কখনো কাগজে লেখে না, মুখেও বলে না- তুমি রোজগার করবে, তুমি কারও বোঝা হয়ে উঠবে না, তুমি ঘরের কোন দিনকেই কঠিন করে তুলবে না। চুক্তিটা এতোটাই নীরব যে নিজেরাও জানি না আমরা তাতে সই করে ফেলেছি। আর যতোদিন আমরা সেই শর্ত মেনে চলি ততোদিন টেরই পাই না যে ভালোবাসার নিচে আদৌ কোনো চুক্তি ছিল।
১৯১২ সালের নভেম্বরে, ঊনত্রিশ বছর বয়সী, প্রাগের এক শ্রমিক, বীমা অফিসের এক কেরানি টানা কয়েক রাত জেগে এই চুক্তিটার কথা লিখে ফেললেন। দিনে তিনি ফাইল সামলাতেন কারখানার আহত শ্রমিকদের- কার আঙুল গেছে, কার কতোটা ক্ষতিপূরণ প্রাপ্য, কোন শরীরটা আর উৎপাদনক্ষম না। রাতে তিনি লেখালেখি করতেন বাবা-মায়ের সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে থেকে, পাশের ঘরে তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে শুনতে। সেই সময় তিনি ফেলিস বাউয়ারকে প্রায় প্রতিদিন চিঠি লিখেছেন। আর সে চিঠিগুলোতে বারবার একই স্বীকারোক্তি ফিরে এসেছে যে- তিনি নিজেকে অন্যদের জীবনের পথে একটা বাধা বলে মনে করেন।
তিন সপ্তাহে শেষ হলো গল্পটা। ফ্রাঞ্জ কাফকা ভেবেছিলেন এটা অসমাপ্ত, অসফল। গল্পের প্রথম বাক্যেই সব শেষ হয়ে যায়। এক অস্থির ঘুমের পর গ্রেগর সামসা সকালে জেগে দেখে সে বিছানায় এক বিশাল পোকা হয়ে গেছে। কোনো ভূমিকা নেই। কোনো ব্যাখ্যা নেই। কোনো অভিশাপ বা জাদুর বিবরণ নেই। কাফকা তার প্রকাশককে আলাদা করে চিঠি লিখে অনুরোধ করেছিলেন বইয়ের প্রচ্ছদে যেন পোকাটাকে কিছুতেই আঁকা না হয়। দূর থেকেও না। তিনি জানতেন একবার ছবি এঁকে ফেললে পাঠক স্বস্তি পেয়ে যাবে- ও, পোকাটা তাহলে ওরকম দেখতে। আর স্বস্তি পেলেই বিষয়টা আর আমাদের নিজেদের সম্পর্কে থাকবে না।
কারণ মেটামোরফসিস মূলত আমাদের সম্পর্কেই। রূপান্তরের পর গ্রেগরের প্রথম ভাবনাটা কী, খেয়াল করুন। ভয় না। আর্তনাদ না। সে ভাবে, পাঁচটার ট্রেনটা তো মিস হয়ে গেল। সে ভাবে, বস কী বলবেন। সে ভাবে, বাবার ঋণটা শোধ করতে আর কতো বছর লাগবে। বোনটাকে কনজারভেটরিতে বেহালা শেখাতে পাঠানোর টাকা কোত্থেকে আসবে। এদিকে তার নিজের শরীর নিচে বিদ্রোহ করছে। অসংখ্য সরু পা শূন্যে হাতড়াচ্ছে। আর সে হিসেব করছে আজকের দিনটা কীভাবে পুষিয়ে দেবে। এখানেই কাফকা আমাদের বুক চিরে ফেলেন-গ্রেগর পোকা হওয়ার অনেক আগেই পোকা হয়ে গিয়েছিল। রূপান্তরটা শুধু শরীরটাকে সেই সত্যের সঙ্গে মিলিয়ে দিল।
যে মানুষ নিজের মূল্য মাপে সে কতোটা কাজে লাগছে তা দিয়ে, অসুস্থতা তার কাছে শুধু কষ্ট না পরিচয়ের বিলুপ্তি।
তারপর শুরু হয় বইয়ের সবচেয়ে নিষ্ঠুর অংশ। যেটা আসলে কোনো দানবের বর্ণনা না বরং পরিবারের ধীর পাটিগণিত। প্রথম কয়েক দিন তারা আতঙ্কিত, তারপর সহানুভূতিশীল, তারপর ক্লান্ত, তারপর বিরক্ত, তারপর ব্যবহারিক। বোন গ্রেটা প্রথমে তাকে খাবার দিতে আসে ভালোবেসে। আস্তে আস্তে আসে দায়িত্ব থেকে। শেষে আসে না। মা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকে। ঢুকতে সাহস পায় না। আর বাবা- যে বাবা এতোদিন অক্ষম ছিলেন, ছেলের রোজগারে বেঁচে ছিলেন- হঠাৎ ইউনিফর্ম পরে আবার শক্ত হয়ে ওঠেন। আর হুট একদিন ছেলের দিকে আপেল ছুঁড়ে মারেন। একটা আপেল গ্রেগরের পিঠে গেঁথে যায়। কেউ সেটা বের করে না। সেটা সেখানেই পচতে থাকে। মাসের পর মাস, তার শরীরের ভেতর। একটা পারিবারিক ক্ষত হয়ে।
তবু গল্পের মাঝখানে একটা মুহূর্ত আছে যেটা পড়লে গলা বন্ধ হয়ে আসে। ভাড়াটেদের সামনে গ্রেটা বেহালা বাজাচ্ছে, আর বসার ঘরের ভাড়াটেরা বিরক্ত হয়ে মুখ ফেরাচ্ছে। শুধু গ্রেগর ধুলোয় মাখা, খাওয়া ছেড়ে দেওয়া, শরীরে পচা আপেল নিয়ে, দরজার ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। কারণ সুরটা তাকে টানছে। ঘরের একমাত্র জীবটি যার ভেতরে তখনো সৌন্দর্যের ক্ষুধা বেঁচে আছে। সে-ই ঘরের একমাত্র জীব যাকে আর মানুষ বলে গোনা হচ্ছে না। কাফকা এখানে প্রশ্নটা ফেলে রাখেন আমাদের কোলে- মানুষ হওয়ার শর্ত তাহলে কী? উপার্জন, নাকি সুরের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এই অক্ষম আকাঙ্ক্ষা?
গ্রেগর মারা যায় ভোরের দিকে। নিঃশব্দে, পরিবারের প্রতি কোনো অভিযোগ ছাড়াই। বরং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই বিশ্বাস নিয়ে যে তার চলে যাওয়াটাই সবার জন্য ভালো। কাজের বুড়ি ঝাঁটা দিয়ে শরীরটা সরিয়ে ফেলে সাথে একটু হালকা রসিকতা করে। আর তারপর কাফকা এমন একটা কাজ করেন যা সাহিত্যে বিরল- তিনি পরিবারটিকে বেড়াতে পাঠান। তারা প্রথমবারের মতো অফিস কামাই করে। ট্রামে চড়ে শহরের বাইরে যায়। সবাই মিলে রোদ পোহায়। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করে। আর মা-বাবা লক্ষ করেন গ্রেটা, অর্থাৎ মেয়েটা কখন যেন সুন্দরী তরুণী হয়ে উঠেছে। এবার একটা ভালো বিয়ে দেওয়া দরকার। গল্পের শেষ বাক্যে গ্রেটা ট্রামের ভেতর শরীরটা টানটান করে মেলে দেয়। বসন্ত। আলো। মুক্তি।
এই স্বস্তিটুকুই বইয়ের আসল দানব। কাফকা আমাদের কাঁদাতে চান না। তিনি চান আমরা যেন আয়নার দিকে তাকিয়ে চিনতে পারি সেই ছোট্ট, লজ্জাজনক, সৎ অনুভূতিটাকে। যেটা দীর্ঘ অসুস্থতার পর কারও মৃত্যুসংবাদ শুনে আমাদের বুকের গভীরে এক সেকেন্ডের জন্য নড়ে ওঠে। আর যেটাকে আমরা সঙ্গে সঙ্গে চাপা দিই শোক দিয়ে।
এই গল্প লেখার পাঁচ বছর পর কাফকার নিজের শরীর তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। যক্ষ্মা ধরা পড়ে। জীবনের শেষ বছরগুলো তিনি কাটান স্যানাটোরিয়ামে গলার ব্যথায় খেতে না পেরে, শুকিয়ে যেতে যেতে, চল্লিশে পৌঁছনোর আগেই চলে যান। তিনি বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে বলে গিয়েছিলেন সব পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলতে। ব্রড কথা রাখেননি- সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে সৌভাগ্যজনক বিশ্বাসভঙ্গ।
ভ্লাদিমির নাবোকভ বহু বছর পর কর্নেলে ছাত্রদের এই গল্প পড়াতে গিয়ে বোর্ডে পোকাটার শারীরবৃত্তীয় গড়ন এঁকে একটা কথা বলেছিলেন, যেটা একবার শুনলে আর ভোলা যায় না। তিনি বলেছিলেন, গ্রেগরের খোলসের নিচে ডানা ছিল। সে পারত উড়ে যেতে, ওই ঘর ছেড়ে, ওই দরজা ছেড়ে, ওই পরিবার ছেড়ে। সে কোনোদিন জানতেই পারেনি।
আমার মনে হয় এই একটি বাক্যেই বইটার সমস্ত শোক জমা আছে। আমরা প্রায় সবাই কোনো না কোনো ঘরে দরজা বন্ধ করে পড়ে থাকি। নিজেদের ভারি মনে করি। ক্ষমা চাই শুধু বেঁচে থাকার জন্য। আর অন্যদের চোখে নিজের মূল্য খুঁজি। ফলে সারাক্ষণ পিঠের ওপর পচা আপেলটার ঠিক পাশেই ভাঁজ করা অবস্থায় থেকে যায় সেই ডানাজোড়া। যার কথা আমরা কোনোদিন জানবো না।
নিশ্চিত জানি, কাফকা পড়ার পর কেউই ভালো বোধ করবে না। কিন্তু পরের বার যখন ঘরের কোণে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকবে, বা কেউ কাজ হারিয়ে চুপচাপ ঘুমোবে দুপুর পর্যন্ত, বা বৃদ্ধ কেউ বারবার একই প্রশ্ন করতে থাকবে- আমি/তুমি হয়তো আধ সেকেন্ড থেমে নিজের ভেতরে জেগে উঠা বিরক্তিটার ওপর মনোযোগ দিবো। ব্যস ওইটুকুই। ওইটুকুর জন্যই বইটা লেখা হয়েছিল সম্ভবত।


