মনে করো যে, গভীর রাতে একটা ঘরে একজন মহিলা একা বসে আছে। তার সামনে ছোট্ট একটা ব্যাগ। ভেতরে শিশুর জামা, কিছু নরম কাপড়, কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস। বাইরে সবাই ঘুমিয়ে। অথচ তার ভেতরে যেন আরেক পৃথিবী জেগে আছে। সে জানে, খুব শিগগিরই তার জীবন বদলে যাবে। কিন্তু কীভাবে বদলাবে তা সে জানে না।
তার ভয় হচ্ছে। আবার অদ্ভুত এক টানও আছে। সে নিজের পেটের ওপর হাত রাখে। ভেতরে যে ছোট্ট প্রাণটি নড়ছে, তার কাছে পৌঁছানোর পথটা এখনও অদৃশ্য। এই মুহূর্তে তার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো, “আমি কি পারবো?”
Kristina Turner-এর Natural Birth: A Holistic Guide to Pregnancy, Childbirth and Breastfeeding বইটা সেই প্রশ্নের খুব কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ায়। তবে এই বই শুধু “কীভাবে সন্তান জন্ম দিতে হবে” তা নিয়ে না। বরং এটা আমাদের চাইল্ড বার্থ নিয়ে তৈরি হয়ে থাকা ভয়, ভুল ধারণা ও দূরত্বকে নতুন করে দেখতে শেখায়। লেখিকা এই বইয়ে প্রি প্রেগ্ন্যান্সি, প্রেগ্ন্যান্সিকালীন সময়, ডেলিভারি, ব্রেস্ট ফিডিং ও মাতৃত্বকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখেন না। এগুলো মূলত একই যাত্রার বিভিন্ন অধ্যায়।
আমরা সন্তান জন্মের কথা বললেই প্রায়ই হাসপাতাল, ডেলিভারি পেইন, বিভিন্ন ধরণের টেস্ট, সে অনুযায়ী চিকিৎসার পাশাপাশি নানা ধরনের হস্তক্ষেপের কথা ভাবি। Turner প্রশ্ন করেন, এর মাঝখানে সেই মহিলা টা কোথায়? যে মানুষটা সন্তান জন্ম দিতে যাচ্ছে? তার ভয় কোথায়? তার শরীরের অনুভূতি কোথায়? তার মানসিক প্রস্তুতি কোথায়? তার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাটুকুই বা কোথায়?
বইটা শুরু হয় একটি শিশুর পৃথিবীতে আসার একেবারে শুরু থেকে অর্থাৎ গর্ভধারণের (Conception) মুহূর্ত দিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় গর্ভাবস্থা (Pregnancy), সন্তানের জন্ম (Delivery) ও বুকের দুধ খাওয়ানোর (Breast Feeding) সময় পর্যন্ত। অর্থাৎ শুধু জন্মের মুহূর্ত না একটি শিশুকে পৃথিবীতে আনার আগে থেকে শুরু করে প্রেগ্ন্যান্সি পরবর্তী পুরো জার্নিকেই বইটি গুরুত্ব দেয়, একেবারে এ টু জেড সবকিছুই কাভার করে।
প্রেগ্ন্যান্সি শুধু শরীরের পরিবর্তন না। একটা শরীরের ভেতরে আরেকটা শরীর তৈরি হওয়া। এই শারীরিক বিল্ট ইনের পাশাপাশি একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে একটি সম্পর্কও। মা ও সন্তানের মধ্যে যে বন্ধনটি জন্মের আগেই শুরু হয় লেখক সেটাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। কারণ চাইল্ড বার্থ মানেই শুধু একটা শিশুর পৃথিবীতে আসা না, মায়েরও এক নতুন জীবনে প্রবেশ।
সন্তান জন্মের মুহূর্তটা শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি ঘটনা না। এটা একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি। একজন নারী যে মুহূর্তে মা হন, সেই মুহূর্তে শুধু একটা শিশুই পৃথিবীতে আসে না। তার নিজের মধ্যেও একটা নতুন পরিচয়ের জন্ম হয়।
Turner তাই চাইল্ডবার্থ-কে শরীর, মন ও আত্মার সম্মিলিত অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখতে চান। তিনি natural birth-এর ধারণাকে কেবল চিকিৎসা-হস্তক্ষেপ কমানোর সঙ্গে যুক্ত করেন না। বরং একজন নারীকে নিজের অভিজ্ঞতার সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে দেখতে চান। এই বইয়ে home birth ও hospital birth দুটো নিয়েই আলোচনা আছে যাতে একজন নারী নিজের জন্য জেনে-বুঝে- শুনে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এই জায়গায় এসে বইটি আমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা ভাবায়।
আমরা জীবনের এতো বড় একটি মুহূর্তের জন্য কতো কিছু প্রস্তুত করি। বাচ্চার জন্য জামা কিনি। রুম ঠিক করি। বিছানা সাজাই। হাসপাতালের ব্যাগ গোছাই। নাম ঠিক করি। অথচ যে মানুষটা এই পুরো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাবে তার নিজের মনটাকে কতোটা প্রস্তুত করি?
ভয়কে আমরা প্রায়ই উত্তরাধিকার হিসেবে দিয়ে দিই।
একজন নারী আরেকজনকে বলেন, “প্রসব (Labor Pain) খুব কষ্টের।”
আরেকজন বলেন, “তুমি জানোই না সামনে কী অপেক্ষা করছে।”
তারপর সেই ভয় আরেকজনের কাছে পৌঁছে যায়। জন্মের আগে শিশুর সঙ্গে সঙ্গে মায়ের মনেও যেন একটি গল্প জন্ম নেয়। আর সেই গল্পের নাম ভয়।
এই বইয়ে Turner সেই গল্পটি বদলে দিতে চেয়েছেন।
তবে এই বইয়ের সৌন্দর্য এ না যে এটা সন্তান ডেলিভারি’কে ভয়হীন, সহজ বা সবসময় সুন্দর বলে দেখায়। বরং এটা জন্মের অভিজ্ঞতার দিকে সচেতনভাবে তাকাতে বলে। শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বোঝতে বলে। চিকিৎসা-সংক্রান্ত সকল সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে বলে। নিজের প্রয়োজন বুঝতে- শিখতে বলে। সর্বোপরি motherhood-এর মানসিক ও আধ্যাত্মিক দিককে গুরুত্ব দিতে বলে।
বিশেষ করে breastfeeding ও lying-in নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বইটা দেখায়, সন্তান জন্ম দেওয়ার মধ্য দিয়েই মায়ের দায়িত্ব বা শিশুর সঙ্গে সম্পর্কের জার্নি শেষ হয় না। বরং জন্মের পর থেকেই মা ও শিশুর মধ্যে একটি নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকে। শিশুকে কাছে রাখা, বুকের দুধ খাওয়ানো, তার প্রয়োজন বোঝা এবং ধীরে ধীরে তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। তাই সন্তান জন্ম দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার ঘটনাটির চেয়ে মা হয়ে ওঠার পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক লম্বা ও গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা ভাবি, সন্তান জন্ম দেওয়ার দিনই একজন নারী মা হয়ে যান। কিন্তু মা হয়ে ওঠার জন্ম একদিনে হয় না। সেটি শুরু হয় অপেক্ষায়। তারপর স্পন্দনে। তারপর ব্যথা, ভয়, বিস্ময়, স্পর্শ, দুধের গন্ধ, নির্ঘুম রাত, শিশুর কান্না এরকম অসংখ্য ছোট ছোট মুহূর্তের মধ্য দিয়েই একজন নারী ধীরে ধীরে নিজের নতুন সত্তাকে চিনতে শেখেন।
Natural Birth পড়তে গিয়ে আমার কাছে বইটার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন natural birth বনাম medical birth না। আমার প্রশ্নটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সে প্রশ্নটা হল-
আমরা কি আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাগুলোর সময় নিজের শরীর, নিজের মন ও নিজের সিদ্ধান্তের সঙ্গে উপস্থিত থাকতে পারি?
কারণ ডেলিভারি মানে শুধু একটা বাচ্চাকে পৃথিবীতে আনা না। ডেলিভারি একজন নারীকেও তার নিজের শরির-মন-মেজাজ সবকিছুর এক নতুন সংস্করণের সামনে দাঁড় করায়।
হয়তো তাই childbirth-এর সবচেয়ে বড় গল্প একটা শিশুর পৃথিবীতে আসার গল্প না। এটা একজন নারীর নিজের ভেতরের শক্তিকে নতুন করে আবিষ্কার করার গল্প।
একদিন সেই নারী সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হবে। ভয় তখনও থাকবে, সামনে কী হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তাও থাকবে। কিন্তু সবকিছুর মাঝেও ধীরে ধীরে তার মনে জন্ম নিতে পারে একটি বিশ্বাস, সে এই নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে পারবে। হয়তো সন্তান জন্ম দেওয়ার সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হলো এই, নিজের ওপর বিশ্বাসটুকু তৈরি করতে পারা।
একটা শিশুকে পৃথিবীতে আনার আগে একজন নারী যদি নিজের শরীরের দিকে একটু ভালোভাবে তাকান, নিজের ভয়কে চিনতে শেখেন, নিজের প্রশ্ন করার অধিকারটুকু ফিরে পান, তখন ডেলিভারি’র গল্পটা আর শুধু গল্প থাকে না।
সেটা হয়ে ওঠে দুজন মানুষের জন্মের গল্প।
একজন পৃথিবীতে আসে।
আর একজন, একই মুহূর্তে, নতুন করে নিজের মধ্যে জন্ম নেয়।
Natural Birth সেই দ্বিতীয় জন্মটির কথাও মনে করিয়ে দেয়।


