অনেক আঁধার পেরিয়ে পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে আমরা সবাই যেন কোনো না কোনো আঁধারের যাত্রী। কেউ হারিয়েছি স্বপ্ন, কেউ হারিয়েছি বিশ্বাস, কেউ হারিয়েছি নিজেকেই। বাইরে থেকে আমাদের যতোই পরিপাটি দেখাক না কেন, ভেতরে ভেতরে প্রত্যেকেই কোনো না কোনো যুদ্ধ লড়ছি। আর সেই যুদ্ধের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মুহাম্মাদ জাভেদ কায়সার যেন মৃদু স্বরে বলে গেলেন, “তুমি একা নও। এই পথে আমিও হেঁটেছি।”
বইটির নামই যেন একটি রূপক। অনেক আঁধার পেরিয়ে অর্থাৎ আলোয় পৌঁছানোর আগে অন্ধকারের দীর্ঘ করিডোর অতিক্রম করা। আমরা সাধারণত আলোকে ভালোবাসি কিন্তু খুব কম মানুষই অন্ধকারের গুরুত্ব বুঝি। অথচ বীজ যেমন মাটির অন্ধকারে জন্মায়, শিশু যেমন মায়ের গর্ভের অন্ধকারে বেড়ে ওঠে, তেমনি মানুষের আত্মাও অনেক সময় অন্ধকারের মধ্য দিয়েই নতুন জন্ম লাভ করে। এই বইটি মূলত সেই পুনর্জন্মের গল্প বলে।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হলো আমরা সফলতার সংজ্ঞা অন্যের হাতে তুলে দিয়েছি। বড় চাকরি, বড় বাড়ি, মোটা বেতন, সামাজিক মর্যাদা এসবকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করতে শিখেছি। বইটির শুরুতেই লেখক সেই প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করেন। তিনি দেখান পৃথিবী আমাদের যে স্বপ্ন বিক্রি করে সেগুলোর অনেকগুলোই মরীচিকার মতো। দূর থেকে জল মনে হয় ঠিকই কিন্তু কাছে গেলে দেখা যায় শুধু বালু আর বালু।
একটি ছোট্ট উদাহরণ তুলে ধরি। ধরুন একজন মানুষ সারাজীবন একটি পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার জন্য ছুটলো। ঘাম ঝরাল, সকল সম্পর্কে ছেদ পড়লো, নিজের শান্তি বিসর্জন দিলো। অবশেষে চূড়ায় পৌঁছে যখন চারপাশে তাকালো তখন আবিষ্কার করলো যে জিনিসটির জন্য এতো বছর দৌড়েছে সেটা আসলে তার হৃদয়ের শূন্যতা পূরণ করতে পারছে না। অনেক আঁধার পেরিয়ে মূলত সেই শূন্যতারই মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় আমার মতো পাঠকদেরকে।
আমি যখন বইটি পড়ছিলাম তখন মনে হচ্ছিল একজন মানুষের হৃদয়ের ডায়েরি পড়ছি। সেখানে আছে ভয়, আশা, হতাশা, অনুশোচনা, ভালোবাসা। আর সবচেয়ে বড় কথা আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
এই বই যেন আমাদের নিজেদের জন্য একটি আয়না। সেখানে আমরা নিজের মুখ দেখি। নিজের ভুল দেখি। নিজের দুর্বলতা দেখি। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো এই আয়না আমাদের ভয় দেখায় না। বরং আমাদের গ্রহণ করে। আমি মনে করি একজন লেখকের সবচেয়ে বড় গুণ হলো মানুষের হৃদয়ের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। এই বইয়ে সেই সহানুভূতি আছে। লেখক জানেন মানুষ দুর্বল। মানুষ বারবার পড়ে যায়। মানুষ অনেক সময় নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই লেখক অনেক সহজ-সরল-সপ্টনেসের মাধ্যমে কথাগুলো বলেন। যে কথাগুলো অনেকটা শীতের সকালের সূর্যের মতো। নরম। মৃদু। তবু উষ্ণ।
আমার কাছে বইটির সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক হলো মানুষের মনের ভেতরের দ্বন্দ্বকে তুলে ধরা। আমরা সবাই জানি কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ। কিন্তু জানার সঙ্গে করার দূরত্বটাই সবচেয়ে কঠিন। ঠিক যেমন একজন ধূমপায়ী জানে যে ধূমপান ক্ষতিকর তবুও সে ছাড়তে পারে না। একজন মানুষ জানে তাকে ক্ষমা করা উচিত, কিন্তু অহংকার তাকে আটকে রাখে।লেখক এসকল মানবিক দুর্বলতাগুলোকে বিচার না করে সেগুলোকে বুঝতে চেষ্টা করেন।
পড়তে পড়তে এক জায়গায় এসে মনে হয়েছে বইটা আসলে একটা লণ্ঠনের মতো। লণ্ঠন সূর্যের মতো পুরো পৃথিবী আলোকিত করতে পারে না। কিন্তু একজন পথিকের সামনে কয়েক কদম পথ স্পষ্ট করে দিতে পারে। জীবনের যাত্রায় অনেক সময় আমাদের এতোটুকুই দরকার হয়। সব প্রশ্নের উত্তর না। শুধু পরবর্তী পদক্ষেপটা দেখার মতো আলো। ব্যস!
আমরা জীবনে কতো কিছু অর্জন করতে চাই। অথচ কখনো কখনো আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অর্জন না প্রত্যাবর্তন। নিজের কাছে ফিরে আসা। সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে আসা। হারিয়ে যাওয়া সরলতার কাছে ফিরে আসা। আমার কাছে এই বই সেই প্রত্যাবর্তনের আমন্ত্রণ।
বইটি আমাকে একটি পুরোনো গাছের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। যে গাছের উপর দিয়ে বয়ে গেছে বহু ঝড়। ভেঙেছে অনেক ডাল-পালা। অনেক পাতা ঝরে গেছে। তবুও সে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ তার শিকড় মাটির গভীরে। মানুষের জীবনও তেমন। বাইরের ঝড় থামবে না। সমস্যার শেষ হবে না। কষ্টও থাকবে। কিন্তু শিকড় যদি শক্ত হয় মানুষ টিকে থাকে।
অনেক আঁধার পেরিয়ে মূলত সেই শিকড়ের কথাই বলে। আত্মার শিকড়। ঈমানের শিকড়। মানুষের ভেতরের সত্যিকারের আশ্রয়ের শিকড়।
বইটি শেষ করার পর আমার মনে হয়নি আমি কোনো বড় জ্ঞান অর্জন করেছি। বরং মনে হয়েছে আমি কিছু পুরোনো সত্য আবার মনে করেছি। যে সত্যগুলো আমি জানতাম কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম। যেমন আমরা সবাই জানি সূর্য প্রতিদিন ওঠে। কিন্তু কোনো এক ভোরে সূর্যোদয় দেখে হঠাৎ আবার বিস্মিত হয়ে যাই। এই বইটিও সেই বিস্ময়ের মতো। এটা নতুন কিছু শেখানোর চেয়ে বেশি করে পুরোনো সত্যগুলোকে নতুন করে অনুভব করায়।
শেষ পর্যন্ত অনেক আঁধার পেরিয়ে আমার কাছে একটা বইয়ের চেয়ে বেশি কিছু। এটা একটা দীর্ঘ রাতের শেষে দূরে দেখা প্রথম আলোর রেখা। এটা ক্লান্ত পথিকের জন্য পথের ধারে রাখা এক পেয়ালা পানি। এটা ঝড়ে হারিয়ে যাওয়া নাবিকের জন্য দূরের বাতিঘর। আর সবচেয়ে বড় কথা এটা এমন একটি স্মরণপত্র যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষ যতো দূরেই হারিয়ে যাক না কেন ফিরে আসার পথ সবসময় খোলা থাকে। কারণ আলোর কাছে পৌঁছানোর জন্য অন্ধকারকে ঘৃণা করতে হয় না। কখনো কখনো অন্ধকারের ভেতর দিয়েই আলোকে চিনতে শেখা লাগে। আর সেই শেখার গল্পই অনেক আঁধার পেরিয়ে।



ভালো লেগেছে।