শৈশবে আমরা সবাই কোনো না কোনো জাদুকরের গল্প শুনে বড় হই। এমন কেউ যে সাধারণ মানুষের সীমা ছাড়িয়ে যায়। যাকে নিয়ে বিস্ময় জাগে, ভয় জাগে, শ্রদ্ধা জাগে। বড় হয়ে আমরা ভাবি, সেই শৈশবের কল্পনা পেছনে ফেলে এসেছি। কিন্তু আসলে কি ফেলে আসি? নাকি সেই একই আকাঙ্ক্ষা- কাউকে দেবতুল্য/জাদুকর করে তোলার আকাঙ্ক্ষা কে আমরা শুধু নতুন এক নাম দিই। আর সেই নতুন নাম হয়- প্রেম?
প্রেমে পড়া মানে আসলে কী? এটা কি কেবল একজন মানুষকে চেনা? নাকি নিজের ভেতরের এক অচেনা ঘরের দরজা হঠাৎ করে খুলে যাওয়া যে ঘরের অস্তিত্বের কথা আমরা নিজেরাই জানতাম না? আহমদ ছফা যখন অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী লিখতে বসেছিলেন তখন তিনি বোধহয় এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজছিলেন না। তিনি প্রশ্নটাকেই আরও গভীর করে তুলছিলেন। কারণ সত্যিকারের বড় প্রশ্নগুলো কখনো উত্তরে শেষ হয় না। তারা কেবল আরও সুন্দরভাবে আমাদের বিভিন্ন ভাবনার মুখোমুখি দাঁড় করায়
এই বই মূলত একটা প্রেমের উপন্যাস। আর তার শিকড় আহমদ ছফার নিজের জীবনের গভীরে প্রোথিত। এটা আত্মজৈবনিক কথাসাহিত্য। যেখানে লেখক তার প্রেম, সম্পর্ক আর নারীর প্রতি নিজের অনুভবকেই ভাষা দিয়েছেন। কথক জাহিদ বসে আছে তার বর্তমান প্রেয়সী সোহিনীর সামনে। তাকে শোনাচ্ছে তার অতীত জীবনের প্রেমের গল্প। এই কাঠামোটা নিজেই একটা গভীর সত্য বহন করে। আমরা কি কখনো কাউকে নতুন করে ভালোবাসতে পারি, তার কাছে নিজের পুরনো সব ক্ষত মেলে না ধরে? সোহিনীর কাছে জাহিদের এই স্বীকারোক্তি যেন প্রেমের এক অলিখিত শর্ত। তুমি যদি সত্যিই আমাকে চাও তাহলে আমার অতীতকেও চাইতে হবে তোমাকে।
সোহিনী এই উপন্যাসে নিছক একজন চরিত্র না। সে একটা রূপক। জাহিদের চোখে অর্ধেক মানবী, অর্ধেক ঐশ্বরিক সত্তা। অর্ধেক আনন্দ, অর্ধেক বেদনা, অর্ধেক সুখ, অর্ধেক কষ্ট। এই “অর্ধেক-অর্ধেক” শব্দবন্ধটাই বইয়ের প্রাণকেন্দ্র। ছফা যেন বলতে চাইছেন প্রেমে পড়া মানুষ কখনোই তার প্রিয় মানুষটাকে সম্পূর্ণভাবে দেখতে পায় না। সে দেখে আধখানা বাস্তব মানুষ আর আধখানা নিজের কল্পনায় গড়া দেবী। আর এই দুই অর্ধেকের মাঝখানে যে টানাপোড়েন সেটাই বোধহয় প্রেমের সবচেয়ে গভীর যন্ত্রণা এবং একইসঙ্গে সবচেয়ে গভীর সৌন্দর্য।
জাহিদ যখন সোহিনীর সামনে বসে নিজের অতীতের কথা বলে তখন এই কাজটা আসলে এক ধরনের সাহস দাবি করে। নিজেকে অসম্পূর্ণ, ক্ষতবিক্ষত, ভুলে-ভরা এক মানুষ হিসেবে মেলে ধরার সাহস। আর সোহিনী সেই স্বীকারোক্তি শুনতে রাজি হয়। এই রাজি হওয়াটাই তো ভালোবাসার একটা রূপ। আমার মনে হয় ছফা এখানে প্রেমের একটা লুকানো শর্ত তুলে ধরেছেন যেটা আমরা সচরাচর স্বীকার করতে চাই না। আমরা চাই কাউকে তার পিক মুহূর্তে ভালোবাসতে। কিন্তু প্রকৃত ভালোবাসা তৈরি হয় তখনই যখন কেউ আমাদের সবচেয়ে অগোছালো, সবচেয়ে অরক্ষিত রূপটাও মেনে নেয়। সোহিনী তাই শুধু একজন প্রেয়সী না। সে জাহিদের কাছে এক ধরনের সাক্ষী, এক ধরনের ক্ষমা।
উপন্যাসের ভেতরে জাহিদের জীবনে আসে আরও দুই নারী- দুরদানা আফরাসিয়াব আর শামারোখ। দুরদানা বিদ্রোহী, সমাজের বাঁধা নিয়মকে ভাঙতে অভ্যস্ত, এক অনন্য সত্তা। যাকে সহজে কোনো ছাঁচে ফেলা যায় না। তার মধ্যে এমন একটা আগুন আছে যা সমাজের গড়ে দেওয়া নারীর সংজ্ঞাকে অস্বীকার করে। শামারোখের মধ্যে আবার অন্য এক জটিলতা। সৌন্দর্য আর আকর্ষণ আছে ঠিকই কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দ্বন্দ্ব আর বিচ্ছিন্নতার এক গভীর অনুভূতি। যেন সৌন্দর্যের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একধরনের নিঃসঙ্গতা। এই দুই নারী জাহিদের জীবনে দুই আলাদা দরজা খুলে দেয়। একটা দরজা বিদ্রোহের, আরেকটা দরজা বিষাদের। আর দুটো দরজা দিয়েই সে নিজের ভেতরের নতুন নতুন অংশ আবিষ্কার করে।
এই দুই নারীর মধ্য দিয়ে ছফা একটা প্রশ্ন তুলে ধরেন যেটা আমার কাছে এই বইয়ের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী জায়গা মনে হয়েছে। একজন পুরুষ কেন একজন নারীর প্রেমে পড়ে? সেটা কি শুধু শরীরের টান নাকি মনের, ব্যক্তিত্বের, নাকি এমন এক রহস্যময় ঐশ্বরিক আকর্ষণ যার কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হয় না? এই প্রশ্নটা এতো পুরনো তবুও এতো তাজা। কারণ প্রতিটা প্রজন্ম প্রতিটা মানুষ নতুন করে এর মুখোমুখি হয়। আর প্রতিবারই মনে হয় এই উত্তর বুঝি এই প্রথম কেউ খুঁজছে।
আমার মনে হয় এখানেই ছফার লেখা তার সময়ের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে। কারণ তিনি প্রেমকে কোনো সরল রোমান্টিক গল্পে বন্দি করেননি। তিনি দেখিয়েছেন প্রেম একই সঙ্গে মুক্তি আর বন্দিত্ব। একই সঙ্গে আরাধনা আর ভয়। নারী এখানে কখনো এমন এক সত্তা হয়ে ওঠে যাকে ঘিরে পুরুষ নিজের ভেতরের সবচেয়ে গোপন সবচেয়ে অরক্ষিত অংশটুকু উন্মোচন করে ফেলে। আর ঠিক এই কারণেই তাকে সে দেবী বানিয়ে ফেলে। কারণ যাকে আমরা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অনুভব করি তাকে সাধারণ মানুষ ভাবতে আমাদের ভয় হয়। দেবীত্ব তখন হয়ে ওঠে এক ধরনের আত্মরক্ষা। নিজের দুর্বলতাকে অন্যের মহিমায় রূপান্তরিত করার এক কৌশল।
এই জায়গাটায় এসে আমার বারবার মনে হয়েছে ছফা যা লিখেছেন তা আসলে শুধু বাঙালি পুরুষের মনস্তত্ত্ব না বরং প্রেমের এক সর্বজনীন প্যাটার্ন। আমরা যাকে গভীরভাবে ভালোবাসি তাকে প্রথমে আমরা প্রায় অতিমানবিক করে তুলি। তার হাসিতে জ্যোৎস্না খুঁজি, তার নীরবতায় গভীরতা খুঁজি। এই আদর্শায়ন আসলে ভালোবাসারই একটা স্বাভাবিক পর্যায়। কিন্তু বিপদ তখনই শুরু হয় যখন আমরা সেই দেবীমূর্তিটাকেই আসল মানুষ ভেবে আঁকড়ে ধরি আর সামনের রক্তমাংসের মানুষটাকে দেখতে ভুলে যাই। ছফার উপন্যাস এই বিপদটাকে এড়িয়ে যায় না বরং তার ভেতরেই ঢুকে পড়ে। আর সেখান থেকে ফিরে আসার পথ খোঁজে।
বইটা পড়তে গিয়ে আমার নিজের জীবনের কথা মনে পড়ে যায়। কীভাবে আমরা কাউকে ভালোবাসতে শুরু করলে তাকে নিজের চোখে বড় করে তুলি। তার সাধারণ হাসিকে অসাধারণ মনে হয়। তার সাধারণ কথাকে মনে হয় গভীর দর্শন। আমার মনে পড়ে কীভাবে প্রথম প্রেমে পড়া মানুষটা সারাদিনে একটা ছোট্ট বার্তার জন্য অপেক্ষা করে যেন সেই বার্তাটাই দিনের সবচেয়ে বড় কিছু। সেই সময়টায় প্রিয় মানুষটার সীমাবদ্ধতা আমাদের চোখে পড়ে না। কারণ আমরা তখন তাকে দেখি না। আমরা দেখি তার ভেতর দিয়ে বিচ্ছুরিত এক আলো। যে আলোটা আসলে আমাদের নিজেদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
আর তারপর ধীরে ধীরে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, সেই মানুষটার মানবিক দিকগুলো আমাদের চোখে ধরা পড়তে শুরু করে। তার ক্লান্তি, তার ভুল, তার সীমাবদ্ধতা, তার রাগ করার ধরন, তার ভয় পাওয়ার কারণগুলো। তখন কি আমরা তাকে কম ভালোবাসি? নাকি তখনই আসলে সত্যিকারের ভালোবাসা শুরু হয়? যখন দেবী নেমে আসে মানুষের কাতারে, আর আমরা তবুও তার পাশে থেকে যাই, তার অসম্পূর্ণতাকেই আলিঙ্গন করি? আমার মনে হয় এটাই সেই কঠিন রূপান্তর। যেখান দিয়ে প্রতিটা দীর্ঘস্থায়ী প্রেমকে একদিন না একদিন যেতে হয়। আরাধনা থেকে স্বীকৃতিতে, মোহ থেকে মমতায়। ছফার উপন্যাস এই প্রশ্নটার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় কোনো সহজ উত্তর না দিয়েই। হয়তো সেটাই এই বইয়ের সততা।
অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী তাই আসলে শুধু একটা প্রেমের গল্প না। এটা মানুষের সেই চিরন্তন দ্বন্দ্বের গল্প যেখানে আমরা যাকে ভালোবাসি তাকে বুঝতে চাই। অথচ পুরোপুরি বুঝে ফেললে হয়তো সেই ভালোবাসার রহস্যটুকুই হারিয়ে যায়। ছফা যেন বলছেন ভালোবাসা মানে হয়তো কাউকে সম্পূর্ণভাবে জেনে ফেলা না বরং তার অর্ধেক অজানা রহস্যকে সম্মান জানিয়ে তার পাশে থেকে যাওয়া।
বাংলা সাহিত্যে প্রেমের উপন্যাস তো কম লেখা হয়নি কিন্তু ছফার এই বইটা আলাদা হয়ে থাকে তার সততার কারণে। এখানে প্রেমকে মহিমান্বিত করার তাড়া নেই বরং তাকে তার সমস্ত জটিলতা, দ্বন্দ্ব আর অসঙ্গতি নিয়েই মেনে নেওয়ার চেষ্টা আছে। জাহিদ কোনো নিখুঁত নায়ক না, সোহিনী-দুরদানা-শামারোখ কেউই কোনো এক-মাত্রিক চরিত্র না। তারা প্রত্যেকে মানুষ, প্রত্যকে নিজ নিজ ভার আর ভয় নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষ। আর এই মানবিকতার মধ্য দিয়েই বইটা তার ঐশ্বরিক মুহূর্তগুলো খুঁজে পায়। কারণ সত্যিকারের বিস্ময় লুকিয়ে থাকে অসম্পূর্ণতার মধ্যেই, নিখুঁততার মধ্যে না।
আর এই বই শেষ করার পর যে অনুভূতিটা থেকে যায় তা কোনো উপসংহার না বরং এক ধরনের কোমল বিস্ময়। এটা মনে করিয়ে দেয় যাকে আমরা সবচেয়ে কাছের ভাবি সে মানুষটার ভেতরেও হয়তো এখনো এমন একটা জগৎ লুকিয়ে আছে যাকে আমরা কোনোদিন পুরোপুরি স্পর্শ করতে পারবো না। হয়তো এটাই ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে ভয়ংকর শর্ত। আমরা কাউকে যতো গভীরভাবেই ভালোবাসি না কেন সে চিরকাল খানিকটা অর্ধেক-অচেনা থেকে যায়। আর সেই অচেনা অংশটুকুর প্রতি বিশ্বাস রাখাই বোধহয় ভালোবাসার আসল সাহস। আহমদ ছফা আমাদের এই সাহসটুকুর কথাই মনে করিয়ে দেন নিঃশব্দে। কোনো উপদেশ ছাড়াই।


