সাইমুম ১১-১৫ঃ যে যুদ্ধ শেষ হয় না, যে পথ ফুরায় না
বলকানের পোড়া মাটি পেরিয়ে আহমদ মুসা যখন পশ্চিমের দিকে মুখ ঘোরান তখন তার যাত্রা কেবল একটি মিশনের গল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা হয়ে ওঠে সভ্যতার স্মৃতিপথে এক গভীর বেদনাময় তীর্থযাত্রা। দানিয়ুব থেকে সিংকিয়াং পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাঁচটি পর্বে আবুল আসাদ রিডারকে শুধু রোমাঞ্চের ঘূর্ণিতে না, ইতিহাসের সেই নিবিড় কক্ষে নিয়ে যান যেখানে একটি সভ্যতার উত্থান ও পতনের ধূলো এখনো বাতাসে ভাসছে।
সাইমুম ১১ঃ দানিয়ুবের দেশে
বলকানের রক্তাক্ত অধ্যায় শেষ হতে না হতেই আহমদ মুসার পথ চলে যায় দানিয়ুবের বুকে সেই নদীর দেশে যেখানে মুসলিম জনপদ একদিন বেঁচে ছিল প্রাণবন্ত হয়ে যা এখন বেঁচে আছে কোনোমতে। স্পেনের বিধ্বস্ত মুসলিম জনগোষ্ঠীতে প্রাণের সবুজ সবে মাথা তুলছিল কিন্তু ষড়যন্ত্রের কালো ছায়া সে আশার আলো নেভাতে উদ্যত। হাসান সেনজিকের মতো সংগ্রামী মানুষেরা যখন অদৃশ্য শত্রুর হাতে কোণঠাসা, তখনই ছুটে আসেন আহমদ মুসা।
শত্রুর ফাঁদ যেন আগে থেকেই পাতা ছিল আর সেই ফাঁদের মধ্যে দাঁড়িয়েও আহমদ মুসা তার মিশন থেকে সরেন না এক পাও।
মজলুমের পাশে দাঁড়ানোই সত্যিকারের বীরত্ব
দানিয়ুবের দেশে শুধু অ্যাকশনের গল্প বলেনা বরং সেই মানুষদের গল্প বলে যারা ভাঙা জনপদে মাথা তুলে দাঁড়াতে চায়। আর একাকী সেই মানুষটির গল্প বলে যিনি তাদের পাশে দাঁড়ান নিজের জীবন বাজি রেখে।
সাইমুম ১২ঃ কর্ডোভার অশ্রু
মাদ্রিদ বিমানবন্দরের মাটিতে পা দিতেই আহমদ মুসা’র সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে যা গৌরবের নয়, বেদনার। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে তারিক বিন যিয়াদ এই মাটিতে পা রেখেছিলেন বিজেতার বুকে আগুন নিয়ে। সেই আগুন আজ নিভে গেছে তবে রয়ে গেছে শুধু ছাই। আর সেই ছাইয়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটু উত্তাপ।
কর্ডোভার মসজিদ এখন গির্জা। একসময় যে নগরী ছিল পৃথিবীর জ্ঞানকেন্দ্র, সে আজ নিজেই ইতিহাসের বন্দী। এই বেদনার শহরে আহমদ মুসার মিশন কেবল শত্রুকে পরাজিত করা না বরং স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা একটি জাতির অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার লড়াই।
হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার চেয়ে ভুলে যাওয়া সভ্যতা বেশি দুঃখজনক
কর্ডোভার চোখে জল। সে জল ইতিহাসের। সে জল পরাজয়ের নয়, সে জল ভুলে যাওয়া গৌরবের।
সাইমুম ১৩ঃ আন্দালুসিয়ার প্রান্তরে
কর্ডোভার অশ্রু মুছতে না মুছতেই আহমদ মুসা’র যাত্রা প্রসারিত হয় আন্দালুসিয়ার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে। এই ভূমিতে একদিন জলপাই বাগানের ছায়ায় মুসলিম কৃষক গান গাইতেন। পণ্ডিতেরা তর্ক করতেন আলোর নিচে। সেই সভ্যতার দেহ মাটিতে মিশে গেলেও আত্মা এখনো ঘুরে বেড়ায় এই প্রান্তরে।
এখানে আন্দালুসিয়ার মুসলিম সংখ্যালঘুদের বর্তমান সংকট ও ষড়যন্ত্রকে ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়ার সাথে বুনে দেন। আহমদ মুসা এখানে কেবল রক্ষক নন। তিনি একজন সাক্ষী, একটি হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার শেষ গল্পকারও।
জ্ঞান সবসময় বইয়ে বা বিশেষজ্ঞের কাছে থাকে না। অভিজ্ঞ মানুষের কথায় কান দেওয়ার মধ্যেও আছে গভীর জ্ঞান।
আন্দালুসিয়ার প্রতিটি পাথর যেন মনে রাখে সেই দিনের কথা যেদিন এই মাটি ছিল জ্ঞান ও ন্যায়ের ভূমি।
সাইমুম ১৪ঃ গোয়াদেল কুইভারে নতুন স্রোত
গোয়াদেলকুইভার- আরবি শব্দ থেকে আসা এই নদীর নামটুকুই বলে দেয় কত গভীরে গেঁথে আছে এই মাটিতে মুসলিম সভ্যতার শিকড়। সেই নদীর তীরে এখন নতুন স্রোত জেগে উঠছে। যা প্রতিরোধের স্রোত, টিকে থাকার স্রোত। কিন্তু পুরনো শক্তি সেই স্রোত রুদ্ধ করতে বদ্ধপরিকর।
এই পর্বে ষড়যন্ত্র আরও গভীর, শত্রু আরও অদৃশ্য। লাল রক্তের হৃদয়হীন সংঘাতের পাশাপাশি আহমদ মুসার জীবনে ঢেউ তোলে এক অনিবার্য মানবিক দ্বন্দ্বও। যদিও হৃদয় দেওয়া-নেওয়ার সেই রোমাঞ্চকর টানাপড়েনে রিডার একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পান, কিন্তু মিশন থামে না।
গোয়াদেল কুইভারের জল ইতিহাস দেখেছে আজও সে দেখছে একজন মানুষের অকুতোভয় লড়াই।
দায়িত্বশীল হওয়া মানে অনুভূতিহীন হওয়া না বরং দুটো একসাথে বহন করার মধ্যেই আছে সত্যিকারের পরিপক্কতা।
সাইমুম ১৫ঃ আবার সিংকিয়াং
আন্দালুসিয়ার সুর্যাস্তের পর ঘুরে তাকানো হয় পূর্বদিকে। অর্থাৎ সেই সিংকিয়াংয়ের দিকে যেখান থেকে আহমদ মুসার জীবনের গল্প শুরু হয়েছিল। যেখানে তার শিকড়, তার শৈশব, তার হারানো পৃথিবী।
আহমদ মুসা’র কাছে সিংকিয়াংয়ে ফেরা মানে শুধুমাত্র নিজের মাতৃভূমিতে ফেরা না। বরং এটি তার আত্মার কাছে ফেরা। উইঘুর মুসলিমদের ওপর দমন-পীড়নের সেই পরিচিত বেদনা আবার সামনে আসে। এবার নতুন সংকটে, নতুন ষড়যন্ত্রে। যে ভূমি তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে, সেই ভূমির জন্যই আবার লড়তে নামেন তিনি।
আবার সিংকিয়াং শিরোনামের এই দুটি শব্দেই একটি জীবনের সমগ্র ট্র্যাজেডি ও সংকল্প একসাথে বাঁধা।
দানিয়ুব থেকে সিংকিয়াং এই পাঁচটি বই একসাথে পড়লে মনে হয় পৃথিবীর মানচিত্রের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে যে কেউ। আর প্রতিটি পদক্ষেপে মাটির নিচ থেকে উঠে আসছে ইতিহাসের গুমরানো কান্না ও টিকে থাকার অদম্য সংগীত।
মানবতার কষ্ট ভৌগোলিক সীমানা মানে না। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মজলুমের জন্য অনুভব করতে পারাই মানবিক বিবেকের পরিচয়।


