সাইমুম ১৬-২০ঃ ক্রুসেডের ছায়া ও আফ্রিকার অন্ধকার
ধরুন কেউ আপনাকে বলল যে একটি বই আছে যেখানে মধ্য এশিয়ার পরমাণু ষড়যন্ত্র আছে, ফ্রান্সের রহস্যময় গুপ্ত সংগঠন আছে, আফ্রিকার জঙ্গলে মুসলিম গ্রামের অস্তিত্বের লড়াই আছে, একটি ফরাসি রাজকুমারীর ইসলাম গ্রহণের গল্প আছে। আর এসব কিছুর মাঝখানে একজনমাত্র মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন-একা, অক্লান্ত, ও অবিচল ভাবে। এসব শুনে আপনি হয়তো ভাবতে পারেন এটি হলিউডের কোনো মেগা-ফ্র্যাঞ্চাইজির স্ক্রিপ্ট। কিন্তু না। এটা আবুল আসাদের সাইমুম সিরিজের ১৬ থেকে ২০ পর্যন্ত বইয়ের ই গল্প। এই পাঁচটি বই ধারণ করে পাঁচটি ভিন্ন মহাদেশীয় প্রেক্ষাপট আর একটিই মাত্র অদম্য সুর।
১৬। মধ্য এশিয়ায় কালোমেঘ
সিংকিয়াং থেকে পশ্চিমে মুখ ঘুরিয়ে আহমদ মুসা এবার মধ্য এশিয়ার নবজাত মুসলিম প্রজাতন্ত্রগুলোর মাটিতে পা রাখেন। সেই ভূমি যা সোভিয়েত পতনের পর সবে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করেছিলো। কিন্তু মুক্তির আলো ছড়িয়ে পড়ার আগেই এ ভুমিতে ছড়িয়ে পড়ে কালোমেঘ। একজন অপহৃত পরমাণু বিজ্ঞানী নবিয়েভকে বাঁচাতে গিয়ে আহমদ মুসা নিজেই পড়ে যান অক্টোপাসের মতো বিস্তৃত রুশ ষড়যন্ত্রের ফাঁদে।
এখানে শত্রু অশরীরি। তাদের গায়ে হাত দেওয়া যায় না, তাদের মুখ দেখা যায় না, তবে শুধু অনুভব করা যায় তাদের উপস্থিতি। এলেনা ও তাতিয়ানার মতো রুশ মেয়ের হঠাৎ আবির্ভাব গল্পে এক অপ্রত্যাশিত মোড় যোগ করে। শত্রুর ভেতরে থেকে যে আলোর শিখা জ্বলে সে আলো কি টিকিয়ে রাখা যাবে? বিশ্বাস ও সন্দেহের এই দ্বন্দ্বই এই পর্বকে করে তোলে অসাধারণ মানবিক।
গ্রেট বিয়ারের থাবা যখন মধ্য এশিয়ার নতুন ডানায় আঘাত হানে তখন একা একজন মানুষের প্রতিরোধই হয়ে ওঠে একটি জাতির অস্তিত্বের শেষ আশ্রয়।
১৭। ব্ল্যাক ক্রসের কবলে
ক্রুসেডের যুগ শেষ হয়েছে বলে আমরা যা জানি আবুল আসাদ তাকে প্রশ্ন করেন এই পর্বে। ‘ব্ল্যাক ক্রস’ একটি নাম যা ইতিহাসের গর্ভ থেকে উঠে এসে নতুন শতাব্দীতে নতুন রক্ত ঝরাচ্ছে। ক্যামেরুনের ওমর বায়া একজন মুসলিম জমিদার। এই ওমর বায়া’র পূর্বপুরুষের ভূমি কেড়ে নিতে চায় ‘কিং ডম অব ক্রাইস্ট’ ও ‘ওকুয়া’। ফলে ওমর বায়া ফ্রান্সে এসে পড়েন ব্ল্যাক ক্রসের কবলে।
ওমর বায়াকে খুঁজতে গিয়ে আহমদ মুসার সংঘাত শুরু হয় সেই সন্ত্রাসী সাম্রাজ্যের সাথে যার হাত ছড়িয়ে আছে মহাদেশ থেকে মহাদেশে। একের পর এক ঢেউয়ের মতো সংকট আছড়ে পড়ে তার ওপর। তবু তিনি থামেন না কারণ মিশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত থামার নিয়ম নেই তার।
ক্রুসেড আজও শেষ হয়নি। শুধু তলোয়ার পাল্টে গেছে, মুখোশ পাল্টে গেছে। কিন্তু নিশানা অপরিবর্তিত।
১৮। ব্ল্যাক ক্রসের মুখোমুখি
সাগরের মাঝখানে একটি ভাসমান বাংলোয় বন্দী ওমর বায়া। চারদিকে শত্রুর ঘেরাও। তথ্য-প্রমাণ হাতে পেয়েছেন আহমদ মুসা। কিন্তু শত্রুর এই অক্টোপাসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে একাই। রেস্টহাউসের লবিতে রক্তমাখা মুখে, আহত শরীরে তিনি লড়াই করেন রাতের পর রাত। আর এক রাতেই ব্ল্যাক ক্রসের ত্রিশ জনের বেশি লোক মারা পড়ে তার হাতে।
কিন্তু এই পর্বের সবচেয়ে আলোকিত মুহূর্ত সেই যুদ্ধে না বরং ডোনার সেই টেলিফোন কলে। যখন ডোনা বুঝতে পারে যে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হয়েছে ঠিক আহমদ মুসার পাশে আর সঙ্ঘে সঙ্ঘে টেলিফোনের লাইন কেটে গেছে তখন ডোনার জ্ঞান হারিয়ে মেঝেয় লুটিয়ে পড়া ইত্যাদি পড়ে রিডাররাও বুঝতে পারে যে একটি মহাযুদ্ধের মাঝে ভালোবাসার একটি সুতো কতোটা নাজুক, কতোটা অপরিহার্য।
আহত শরীরে, অন্ধকার রাতে, একা। তবু তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন। কারণ পড়ে গেলে যাদের জন্য লড়ছেন তারাও পড়ে যাবেন।
১৯। ক্রস এবং ক্রিসেন্ট
শিরোনামেই সভ্যতার সবচেয়ে পুরনো দ্বন্দ্বটি ধরা আছে। ‘ক্রস এবং ক্রিসেন্ট’ দুটো চিহ্ন, দুটো পৃথিবীদর্শন, দুটো পথ। এই পর্বে আবুল আসাদ সেই দ্বন্দ্বকে কেবল সংঘাতে না বরং কথোপকথনে নিয়ে আসেন। বুরবোঁ রাজকুমারী ডোনার ইসলাম গ্রহণ ও পিয়েরা, লুই ডোমাস, এলিসা গ্রেসের সাথে তার ধর্ম বিষয়ক আলোচনা ইত্যাদির মাধ্যমে।
এই আলোচনাগুলো পড়তে পড়তে রিডাররা মাস্ট থমকে যাবে। কারণ আবুল আসাদ এখানে শুধু থ্রিলার লিখেননি । তিনি লিখছেন এমন এক সংলাপ যা শতাব্দীর প্রশ্নগুলোকে মুখোমুখি করে দেয়। ডোনার সেই একটি কথা “যে ধর্ম কেবল গির্জায় বন্দী সে ধর্ম মানুষের জীবন পরিচালনা করতে পারে না।” এটি শুধু একটি উপন্যাসের সংলাপ না, এটি একটি সভ্যতার প্রতি প্রশ্ন।
ক্রস আর ক্রিসেন্টের লড়াই বন্দুকে শেষ হয় না। সেটা শেষ হয় বা শুরু হয় একটি সৎ প্রশ্নে, একটি খোলা হৃদয়ে।
২০। অন্ধকার আফ্রিকায়
আফ্রিকাকে পাশ্চাত্য বলেছে “অন্ধকার মহাদেশ”। আবুল আসাদ এই পর্বে সেই নামটি নিয়েছেন কিন্তু বিপরীত অর্থে ব্যবহার করেছেন। এখানে অন্ধকার আফ্রিকার মাটিতে না। অন্ধকার সেই চিন্তায় যা এই মাটিকে দখল করতে চায়। ‘কিং ডম অব ক্রাইস্ট’ (কোক) আর ‘ওকুয়া’ এদুটো সংগঠন মিলে দক্ষিণ ক্যামেরুনের শেষ মুসলিম ভূমিটুকু গ্রাস করতে উদ্যত।
ক্যামেরুনের পথে ছুটে চলা আহমদ মুসার বুক ভরা উদ্বেগ। ওমর বায়া, ড. ডিফরজিস সহ একাধিক জীবন তার হাতের ওপর নির্ভর করছে। এখানে লড়াই শুধু ব্যক্তির সাথে না। একটি জনগোষ্ঠীর শেষ পরিচয়, শেষ ভূমি রক্ষার লড়াই। যে আফ্রিকাকে পাশ্চাত্য অন্ধকার বলেছে সেই আফ্রিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে আহমদ মুসা বুঝিয়ে দেন আলো আর অন্ধকারের সংজ্ঞা কারা নির্ধারণ করে আর সেটাও একটা রাজনীতি।
আফ্রিকার ‘অন্ধকার’ তার মাটিতে না, তার সম্পদ ও পরিচয় কেড়ে নিতে আসা সেই হাতগুলোয় যা নিজেদেরকে আলোর দূত বলে পরিচয় দেয়।
পরিশেষে বলবো, সাইমুম সিরিজ পড়া শেষ করে বই বন্ধ করলে একটাই অনুভূতি থাকে আর সেটা হল- দায়িত্ববোধ। নিজের ইতিহাস জানার, নিজের পরিচয় টিকিয়ে রাখার, ও পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মজলুমের পাশে মনে মনে হলেও দাঁড়ানোর দায়িত্ব। আবুল আসাদ এই কাজটিই করেছেন। তিনি সাইমুম সিরিজে বিনোদন দেননি শুধু, তিনি মানুষের বিবেককে জাগিয়েছেন।


