কিছু ক্লান্তি শরীরে জমে না, জমে হৃদয়ে। দিনের পর দিন সবাইকে সময় দিতে দিতে, সবার প্রত্যাশা পূরণ করতে করতে হঠাৎকরে একসময় মনে হয় নিজের জন্য যেন আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। হয়তো অনেক দিন সেই অনুভূতির নামই জানতাম না। বা জানলেও বিষয়টাকে অতোটা একনলেজ করিনি। শুধু অনুভব করতাম ভেতরে কোথাও এক ধরনের নীরব ভার জমে আছে। তবে সেট বাউন্ডারিস বইটি পড়তে গিয়ে প্রথমবারের মতো বুঝলাম যে সেই ভারের কারণ সবসময় অন্য মানুষ না। অনেক সময় নিজের বাউন্ডারি ছাড়া জীবন যাপনও একপ্রকার ভার তৈরি করে দেয়, নিজেকে ক্লান্ত করে তুলে।
আমরা ছোটবেলা থেকেই যেন একটি অদৃশ্য শিক্ষা নিয়ে বড় হই। আমাদের শেখানো হয় ভদ্র হতে, সহনশীল হতে, সবাইকে খুশি রাখতে। ফলে “না” বলাকে অভদ্রতা মনে করতে শিখি। নিজের প্রয়োজনকে শেষের সারিতে রাখতে রাখতে একসময় সেটাই স্বাভাবিক হয়ে যায়। হয়তো ভেবেছিলাম এভাবেই ভালো মানুষ হওয়া যায়। কিন্তু একদিন বুঝলাম ভালো মানুষ হতে গিয়ে আমি নিজের প্রতিই ভালো থাকতে ভুলে গেছি।
তুমি কি কখনো এমন কোনো সন্ধ্যার মুখোমুখি হয়েছো যেখানে দিনশেষে মনে হয়েছে তুমি অনেক কাজ করেছ, অনেক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছো, অনেক গুড ভাইব, পজিটিভিটি উপহার দিয়েছো আশে পাশের মানুষকে অথচ তোমার নিজের ভেতরটা অদ্ভুত রকম ফাঁকা? কেউ তোমাকে আঘাত করেনি তবুও যেন কোথাও একটা নীরব ব্যথা জমে আছে। সেই ব্যথার কোনো নাম নেই। শুধু মনে হয় নিজের জীবনে নিজের উপস্থিতিটাই ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
এই বইটি পড়তে গিয়ে আমি বুঝলাম সেই শূন্যতার একটা কারণ হয়তো ছিল নিজের চারপাশে কোনো বাউন্ডারি না থাকা। সবাইকে ভালো রাখতে গিয়ে আমি কখন কোথায় থামবো সেটাই ভুলে গিয়েছিলাম। অথচ বাউন্ডারি তৈরি করা মানে কাউকে দূরে সরিয়ে দেওয়া না। কিংবা সম্পর্কের দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া না। বরং এটা নিজের প্রতি সৎ হওয়ার একটা উপায়। আমি শিখলাম প্রতিটি দরজা সবসময় খোলা রাখার প্রয়োজন নেই। কখনো কাউকে কাছে আসতে দিতে হয় আবার কখনো নিজের একটু শান্তির জন্য দরজাটা বন্ধও রাখতে হয়। এতে ভালোবাসা কমে যায়না বরং ভালোবাসার ভেতর নিজের জন্যও একটু শ্বাস নেওয়ার জায়গা তৈরি হয়।
আমাদের জীবনের অনেক সম্পর্ক আসলে ভেঙে যায় কোনো বড় ঘটনার জন্য না। ভেঙে যায় অসংখ্য ছোট ছোট অব্যক্ত কষ্টের ভারে। আমি যখন ক্লান্ত হয়েও “ঠিক আছি” বলি, যখন কষ্ট পেয়েও হাসি, যখন না চাইতেও হ্যাঁ বলি, তখন সম্পর্কের ভেতরে অদৃশ্য এক দূরত্ব জন্ম নিতে থাকে। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক দেখায় কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি একটু একটু করে হারিয়ে যেতে থাকি।
এই বই পড়তে পড়তে বুঝলাম আত্মত্যাগ আর আত্মবিসর্জনের মধ্যে সূক্ষ্ম একটি পার্থক্য আছে। ভালোবাসার জন্য কিছু ছেড়ে দেওয়া সুন্দর। কিন্তু যদি প্রতিদিন নিজের ইচ্ছা, নিজের বিশ্রাম, নিজের অনুভূতি, নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিতে হয়, তাহলে একসময় ভালোবাসার জায়গায় ক্লান্তি এসে বসে। তখন সম্পর্ক থাকে ঠিকই কিন্তু শান্তি থাকে না।
খেয়াল করলে বুঝতে পারবে আমরা অনেকেই “না” বলার আগে অপরাধবোধে ভুগি। মনে হয় আমি যদি নিজের জন্য সময় চাই তাহলে মানুষ আমাকে স্বার্থপর ভাববে। আমি যদি কোনো অনুরোধ ফিরিয়ে দিই তাহলে হয়তো সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে। অথচ সেটিং বাউন্ডারি পড়ার মাধ্যমে বুঝতে পারলাম, যে সম্পর্ক একটি সম্মানজনক “না” শুনতে পারে না সেই সম্পর্কের ভেতরে আগে থেকেই কোথাও না কোথাও অসমতা ছিল।
এই বই পড়তে গিয়ে একটা জায়গায় এসে আমি সত্যিই থেমে গিয়েছিলাম। বুঝতে পেরেছিলাম কতো বছর ধরে আমি অন্য মানুষের অনুভূতির দায় নিজের কাঁধে বয়ে বেড়িয়েছি, এখনো বেড়াচ্ছি। কেউ রাগ করলে মনে হয়েছে নিশ্চয়ই আমারই কোনো ভুল হয়েছে। কেউ কষ্ট পেলে নিজেকে দোষ দিয়েছি। কেউ হতাশ হলে নিজের ইচ্ছেটাকে সরিয়ে রেখে তাকে খুশি করার চেষ্টা করেছি। এসব করতে করতে একটা সময় পর নিজেকেই প্রশ্ন করলাম অন্যদের অনুভূতির ভার বইতে বইতে আমার নিজের অনুভূতিগুলোর কী হলো? কতোবার এমন কিছু করেছি যা আমি করতে চাইনি। তবুও করেছি শুধু কেউ হতাশ হবে মনে করে! কতোবার শরীর-মন দুটোই ক্লান্ত ছিল তবুও “না” বলতে পারিনি! কতোবার নিজের ভেতরের ছোট্ট কণ্ঠটা বলেছে, “আমারও একটু বিশ্রাম দরকার”, আর আমি সেই কণ্ঠকে চুপ করিয়ে অন্যের প্রত্যাশার শব্দ শুনেছি। তখন হঠাৎ মনে হয়েছে আমি যেন নিজের জীবনটা বাঁচছি না বরং অন্য কারও লেখা একটা চরিত্রের অভিনয় করে যাচ্ছি। আমি কাউকে ভালোবাসতে পারি, তার কষ্ট বুঝতে পারি, তার পাশে দাঁড়াতে পারি, কিন্তু তার প্রতিটি অনুভূতির দায়ভার আমার না। কাউকে সুখী রাখতে গিয়ে যদি প্রতিদিন নিজেকে আমার একটু একটু করে হারিয়ে ফেলতে হয়, নিজের সাধ- আহ্লাদের কবর দিতে হয় তাহলে সেই সুখের মধ্যে আমার জন্য আর কতোটুকুই বা জায়গা থাকে?
বইটি পড়ে বুঝতে পারি যে বাউন্ডারি সেট করা মানে আসলে অন্যকে বদলানোর চেষ্টা করা না। বরং এর মাধ্যমে নিজেকে, নিজের প্রয়োজনকে, ও নিজের প্রতি নিজের যে ভালোবাসা সেটা স্পষ্ট করে জানানোর সাহসটা দেখানো হয়। বাউন্ডারি সেটিং এর মাধ্যমে আমি বলতে পারি “এভাবে কথা বললে আমার কষ্ট হয়।” আমি বলতে পারি “আজ আমি বিশ্রাম নেব।” আমি বলতে পারি “এটা আমি করতে পারবো না।” তবে একথাগুলো শুনতে যতোটা সাধারণ মনে হয় বলতে তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। কারণ আমাদের ভেতরে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ভয় কাজ করে এই ভেবে যে যদি মানুষ আমাকে ভুল বোঝে?! কারো যদি আমার এই বাউন্ডারি’র ফলে কষ্ট হয়!! তবে ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেছি যে এ সমস্ত শর্ট টার্ম ভুল বোঝাবুঝির চেয়েও ভয়ংকর হলো নিজেকে হারিয়ে ফেলা।
আমার খুব ভালো লেগেছে যে বইটি বাউন্ডারি সেটিংকে কোনো কঠোর নিয়মের তালিকা বানায়নি। বরং মনে করিয়ে দিয়েছে প্রতিটি মানুষের বাউন্ডারি আলাদা। আমার যে বিষয়টি আমাকে ক্লান্ত করে, সেটা হয়তো তোমাকে ক্লান্ত করে না। আমার যে নীরবতা দরকার, সেটা হয়তো তোমার দরকার নেই। তাই বাউন্ডারি তুলনা করার বিষয় না, এটা নিজের ভেতরের সত্যকে চিনে নেওয়ার বিষয়।
বইটি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল মানুষের হৃদয়টা যেন একটা বাড়ির মতো। সেই বাড়ির দরজা যদি সবসময় খোলা থাকে তাহলে অতিথির সঙ্গে সঙ্গে ধুলো- ময়লা, ঝড়-ঝঞ্ঝাট এর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরণের অহেতুক ইন্টারনাল- এক্সটারনাল শব্দও ভেতরে ঢুকে পড়ে। আবার দরজা যদি সবসময় বন্ধ থাকে তাহলে আলোও ঢোকে না। তাই শান্তির জন্য দরজা থাকা যেমন জরুরি তেমনি দরজা টা কখন খুলতে হবে আর কখন বন্ধ রাখতে হবে সেই বোধটাও থাকা সমান জরুরি।
আমরা প্রায়ই ভাবি ভালোবাসা মানে সবকিছু সহ্য করা। অথচ হয়তো ভালোবাসার আরেকটি ভাষা আছে যেখানে সম্মান, সততা আর স্পষ্টতা একসঙ্গে থাকে। যেখানে কাউকে আঘাত না করেও নিজের অবস্থান জানানো যায়। যেখানে নীরব কষ্ট জমিয়ে রাখার বদলে কোমলভাবে সত্য বলা যায়।
শেষ পৃষ্ঠা বন্ধ করার পর আমার মনে খুব নীরব এক শান্তি নেমে এসেছিল। মনে হয়েছিল এতোদিন ধরে আমি নিজের জীবনের দরজায় দাঁড়িয়ে সবাইকে ভেতরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছি কিন্তু নিজেকেই কখনো ভেতরে ডাকি নি। এবার হয়তো সময় এসেছে নিজের জন্যও একটি চেয়ার রেখে দেওয়ার। নিজের ক্লান্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার। নিজের অনুভূতির পাশে বসার।
তুমি যদি এই বইটি পড়ো হয়তো তোমার জীবন একদিনে বদলে যাবে না। কিন্তু তুমি একটি প্রশ্ন নিয়ে ফিরে আসবে। এমন একটি প্রশ্ন যার উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই মানুষ ধীরে ধীরে নিজের কাছে পৌঁছায়। সে প্রশ্নটা হল- আমি কি সত্যিই অন্যদের ভালোবাসতে গিয়ে নিজেকেও সমানভাবে ভালোবেসেছি? হয়তো শান্তি কোনো দূরের গন্তব্য না। হয়তো শান্তি শুরু হয় সেই ছোট্ট মুহূর্তে যখন আমরা প্রথমবার বিনা অপরাধবোধে বলি, “আজ আমি নিজের কথাও শুনবো।” আর সেই মুহূর্তেই বাউন্ডারি কোনো বিচ্ছেদের প্রতীকে থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে নিজের ভেতরের ঘরে ফিরে যাওয়ার দরজা।


