মনে করো জীবনের কোনো এক বিকেলে এমন একজন মানুষের সঙ্গে তোমার দেখা হলো। যার সঙ্গে কথা বলতে বলতে হঠাৎ মনে হলো এই মানুষটাকে তুমি অনেকদিন ধরেই চেনো। অথচ তোমাদের পরিচয় হয়েছে সেদিনই। তার সঙ্গে কথা বললে নিজের এমন কিছু কথাও বেরিয়ে আসে যেগুলো তুমি আগে নিজেকেও বলোনি।
তারপর একদিন বুঝলে মানুষটিকে তুমি প্রচন্ড পরিমাণে ভালোবেসে ফেলেছো। আর ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন জায়গাটা এখানেই শুরু হয়। কারণ একজন মানুষকে ভালোবাসা আর তাকে নিজের করে পাওয়া সবসময় এক কথা না।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতা আমার কাছে ঠিক সেই জায়গার গল্প। প্রেম এখানে শুধু কাছে আসার গল্প না বরং কখনো কখনো দূরে সরে গিয়েও কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসার গল্প।
গল্পের শুরু অমিত রায়ের সঙ্গে। বিলেতে পড়াশোনা করা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধির, আত্মবিশ্বাসী ও কিছুটা আত্মমুগ্ধ। প্রচলিত জীবনযাপন বা প্রচলিত সাহিত্যবোধকে খুব একটা পাত্তা দেয় না। তার কথাবার্তায় যুক্তি আছে, রসবোধ আছে, আবার নিজের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এক ধরনের আত্মতৃপ্তিও আছে। অমিতের সঙ্গে শিলংয়ে দেখা হয় লাবণ্যের।
লাবণ্য অমিতের মতো না। তার মধ্যে এক শান্ত গভীরতা আছে। সে শুধু সুন্দরী না তার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার চিন্তা করার ক্ষমতা। অমিত আর লাবণ্যের সম্পর্ক তাই প্রথম থেকেই শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক হয়ে ওঠে না। তারা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলে, তর্ক করে, নিজেদের ধারণাকে প্রশ্ন করে।
এখানেই ‘শেষের কবিতা’র প্রেমটা অন্যরকম হয়ে ওঠে। অমিত লাবণ্যকে ভালোবাসে। লাবণ্যও অমিতকে ভালোবাসে। কিন্তু তাদের ভালোবাসার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটি সম্ভবত এই যে তারা একে অন্যকে শুধু পাওয়ার জন্য ভালোবাসে না।
আমরা প্রেমকে প্রায়ই মালিকানার ভাষায় ভাবি।
‘সে আমার।’
‘আমি তাকে হারাতে চাই না।’
‘সে আমার সঙ্গে থাকবে।’
কিন্তু লাবণ্য যেন ধীরে ধীরে প্রশ্ন তোলে- কাউকে ভালোবাসার অর্থ কি তাকে নিজের জীবনের নির্দিষ্ট একটা জায়গায় আটকে রাখা?
এ প্রশ্নটাই উপন্যাসটাকে আমার কাছে অনেকখানি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
অমিত ও লাবণ্যর প্রেম যতো গভীর হয় তারা বুঝতে পারে তাদের দুজনের ব্যক্তিত্বও ততো শক্তিশালী। তারা একে অন্যকে ভালোবাসে কিন্তু একই সঙ্গে তারা দুজনেই স্বাধীন মানুষ। আর ভালোবাসার ভেতর সেই স্বাধীনতাটুকু ধরে রাখা সহজ না।
কারণ আমরা যাকে ভালোবাসি তাকে হারানোর ভয় থেকেই অনেক সময় তাকে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে চাই। কিন্তু ভালোবাসা যদি কাউকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা হয় তাহলে সেখানে ভালোবাসার সঙ্গে অল্প অল্প করে মালিকানাও ঢুকে পড়ে।
লাবণ্য অমিতকে ভালোবাসে কিন্তু সে নিজের জীবনকে শুধু অমিতকে ঘিরে বানাতে চায় না। অমিতও বুঝতে পারে তাদের প্রেম যতো সুন্দর, তাদের সংসার হয়তো ততোটা সুন্দর নাও হতে পারে। কারণ প্রেমের মানুষ আর জীবনসঙ্গী সবসময় একই মানুষ হবে এমন কোনো নিয়ম নেই।
এই সত্যিটা মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। কারণ আমরা যাকে ভালোবাসি তাকে হারিয়ে অন্য কারও সঙ্গে জীবন কাটানোর কথা ভাবতেই চাই না। আমাদের মনে হয় তাহলে তো ভালোবাসাটাই মিথ্যে হয়ে যাবে।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এখানে অন্য একটা সম্ভাবনা দেখান। আর সেটা হল- কিছু ভালোবাসা জীবনে থাকার জন্য আসে না। কিছু ভালোবাসা আসে আমাদের ভেতরটাকে বদলে দেওয়ার জন্য।
অমিত আর লাবণ্যর সম্পর্কও যেন তেমন। তাদের প্রেমের শেষটা তাই প্রচলিত অর্থে সুখের না। কিন্তু এটাকে নিছক ট্র্যাজেডিও বলা যায় না। কারণ তারা একে অন্যকে পেয়েছিল।
একটা সময়ের জন্য হলেও তারা এমন একজন মানুষ পেয়েছিল যার সামনে নিজেদের সবচেয়ে সত্যিকারের রূপটা প্রকাশ করতে পেরেছিল। আর কখনো কখনো জীবনে এটুকুনই অনেক।
‘শেষের কবিতা’ পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্কের কোনো সহজ নাম হয় না। কিছু মানুষ আসে আমাদের সঙ্গে কয়েকটা বছর বা কয়েকটা ঋতু থাকে তারপর চলে যায়। কিন্তু চলে যাওয়ার পরও তারা আমাদের ভেতরে থেকে যায়।
কেউ হয়তো আমাদের জীবনের অংশ হয়ে থাকে না ঠিকই তবে আমাদের মানুষ হয়ে ওঠার অংশ হয়ে যায়।
এই জায়গাটাতেই উপন্যাসটা শুধু প্রেমের গল্প না হয়ে জীবনের গল্প হয়ে ওঠে।
আর রবীন্দ্রনাথের ভাষার সৌন্দর্য এখানে আলাদা করে বলতেই হয়। অমিতের বুদ্ধিদীপ্ত কথোপকথন, লাবণ্যের সংযত অনুভূতি, তাদের তর্ক, হাসি, কবিতা, চিঠি, সব মিলিয়ে বইটি যেন গল্পের চেয়ে বেশি কিছু। কখনো মনে হয় আমি উপন্যাস পড়ছি, আবার কখনো মনে হয় দুজন মানুষের ব্যক্তিগত কথোপকথনের পাশে বসে আছি।
তবে ‘শেষের কবিতা’র সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য আমার কাছে তার প্রেমে না, তার অসম্পূর্ণতায়। কারণ পূর্ণতা অনেক সময় গল্পের শেষ করে দেয়। কিন্তু অসম্পূর্ণতা আমাদের সঙ্গে থেকে যায়।
যে মানুষটিকে আমরা পাইনি, যে সম্পর্কটা শেষ পর্যন্ত আমাদের হয়নি, যে কথাটা বলা হয়নি, যে জীবনটা একসঙ্গে বাঁচা হলো না, সেগুলোই অনেক সময় আমাদের সবচেয়ে দীর্ঘ স্মৃতি হয়ে থাকে।
লাবণ্যর সিদ্ধান্ত তাই শুধু অমিতকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত না। এটা নিজের অস্তিত্বকে অক্ষুণ্ণ রাখারও সিদ্ধান্ত।
আর অমিতের জন্যও এই বিচ্ছেদ এক ধরনের পরিণতিতে পৌঁছানো। সে বুঝতে শেখে ভালোবাসা মানে সবসময় কাউকে কাছে পাওয়া না। কখনো কখনো ভালোবাসা মানে এমন একজন মানুষকে তার নিজের পথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া যাকে তুমি নিজের জীবনে রাখতে চেয়েছিলে।
হয়তো এ কারণেই ‘শেষের কবিতা’ এতো বছর পরও পুরোনো লাগে না। কারণ প্রেম বদলায়নি।আজও আমরা এমন একজনকে ভালোবাসি, তাকে হারানোর ভয় পাই, তার ওপর অধিকার ফলাতে চাই, আবার একই সঙ্গে চাই সে আমাদের ভালোবাসুক নিজের ইচ্ছায়।
আজও এমন সম্পর্ক আছে যেখানে দুজন মানুষ একে অন্যকে খুব ভালোবাসে, কিন্তু তাদের জীবন একসঙ্গে চলার জন্য তৈরি না।
আর আজও আমাদের শিখতে হয় সব ভালোবাসার শেষ ঠিকানা সংসার না। কিছু ভালোবাসার শেষ ঠিকানা স্মৃতি। কিছু মানুষের সঙ্গে আমাদের পথ মেলে না কিন্তু তারা আমাদের পথ চিনিয়ে দিয়ে যায়।
‘শেষের কবিতা’ শেষ করার পর তাই আমার মনে হয় না যে অমিত আর লাবণ্যর প্রেম শেষ হয়ে গেছে। বরং তারা যে মুহূর্তগুলো একসঙ্গে বেঁচেছিল সেখানেই তাদের প্রেম তার সবচেয়ে পূর্ণ রূপ পেয়েছিল।
হয়তো এটাই জীবনের অদ্ভুত নিয়ম। কিছু মানুষকে আমরা হারাই অথচ তাদের ভালোবাসার কারণে নিজেদের আরও একটু খুঁজে পাই। আর কিছু সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় বলেই তারা শেষ হয়ে যায় না। কিছু সম্পর্কের শেষই হয়ে ওঠে তাদের সবচেয়ে দীর্ঘ কবিতা।


