তুমি হারিয়ে গেছো, এসো, পথটা একসাথে খুঁজিঃ তারাফুল, আব্দুল্লাহ মাহমুদ নজীব
কখনো কখনো মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় দূরত্ব কোনো শহর, কোনো দেশ বা কোনো মানুষের সঙ্গে তৈরি হয় না। তৈরি হয় নিজের ভেতরের সেই জায়গাটির সঙ্গে যেখানে একসময় আমরা খুব সহজেই পৌঁছে যেতে পারতাম।
শৈশবে আমাদের পৃথিবী ছিল ছোট, অথচ পূর্ণ। একটি বিকেল অনেক দীর্ঘ মনে হতো। বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে জানালার পাশে বসে থাকা ছিল একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা। কোনো প্রিয় মানুষের কণ্ঠস্বরই মন ভালো করে দিতে পারত অনায়াসে। আমরা তখনও জানতাম না জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতগুলো অনেক সময় দৃশ্যমান হয় না। তারা ধীরে ধীরে তৈরি হয়। ব্যস্ততার মধ্যে। অভ্যাসের মধ্যে। এমন সব দিন পার হতে হতে যেদিন আমরা নিজেদের সঙ্গে কথা বলার সময়টুকুও খুঁজে পাই না।
তারপর একদিন হঠাৎ আমরা আবিষ্কার করি যে আমাদের জীবনে সবকিছুই আছে, অথচ শান্তি নেই।
আমরা কাজ করি, হাসি, কথা বলি, পরিকল্পনা করি, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করি। বাইরে থেকে আমাদের জীবন এগিয়ে যায়। কিন্তু ভেতরে কোথাও একটি নীরব প্রশ্ন স্থির হয়ে থাকে-
আমি কি সত্যিই আমার জীবন যাপন করছি নাকি শুধু দায়িত্বগুলো পালন করে যাচ্ছি?
সম্ভবত মানুষের আল্লাহ প্রদত্ত হেদায়েত এর সংকটের শুরু এখানেই। যখন সে আল্লাহকে পুরোপুরি অস্বীকার করে না তবে আল্লাহকে অনুভবও করতে পারে না। যখন সে জানে যে কোন পথে যেতে হবে অথচ প্রতিদিন একটু একটু করে সেই পথ থেকে দূরে সরে যায়। যখন সে জানে তার হৃদয়ের গভীরে একটি শূন্যতা আছে কিন্তু সেই শূন্যতার নাম উচ্চারণ করতে ভয় পায়।
তারাফুল আমার কাছে সেই নামহীন শূন্যতার দিকে তাকানোর একটি আমন্ত্রণ।
এটি কেবল ধর্ম নিয়ে কথা বলেনা বরং মানুষের নিজের কাছে ফিরে আসার এক অলৌকিক আহবান। এমন এক আহবান যেখানে ঈমান কোনো নিখুঁত মানুষের অলংকার না বরং একজন অসম্পূর্ণ মানুষের বারবার ফিরে আসার সাহস। কারণ হয়তো মানুষ কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। কখনো কখনো তাকে শুধু থামতে হয়। নিজের ভেতরকার নীরবতা শুনতে হয়। আর বুঝতে হয় ফিরে আসার পথটি এতোদিন তার কাছেই ছিল।
ধর্ম যখন শুধু জ্ঞান না হয়ে জীবনের প্রশ্ন হয়ে ওঠে
ধর্ম নিয়ে আমরা অনেক কিছু জানি। আমরা নিয়ম জানি, বিধান জানি, কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয় ইত্যাদি সবই জানি। কিন্তু সেই জানা ও বেঁচে থাকার মধ্যে যে বিশাল দূরত্ব সেটি অতিক্রম করা খুব কঠিন।
একজন মানুষ নামাজ সম্পর্কে জানে কিন্তু নামাজ তার জীবনের আশ্রয় হয়ে ওঠে না। একজন মানুষ দুআর গুরুত্ব জানে কিন্তু বিপদ না এলে তার হাত আকাশের দিকে ওঠে না। একজন মানুষ মৃত্যুকে সত্য বলে বিশ্বাস করে কিন্তু প্রতিদিনের জীবন এমনভাবে কাটায় যেন মৃত্যু কেবল অন্য মানুষের জন্য। আমাদের এই দ্বৈত জীবনই সম্ভবত মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট।
আমরা বিশ্বাস করি কিন্তু সবসময় সেই বিশ্বাস অনুযায়ী বাঁচি না। আমরা আল্লাহকে ভালোবাসি বলি কিন্তু আল্লাহ্র জন্য সময় বের করতে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আমরা জানি পৃথিবী ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু ক্ষণস্থায়ী জিনিসগুলোর জন্য আমাদের সমস্ত শক্তি ব্যয় করি।
এই দ্বন্দ্বের জায়গাতেই তারাফুল সবচেয়ে বেশি মানবিক। কারণ বইটি এমন কোনো দূরের নিখুঁত মানুষের জন্য লেখা না যে কখনো ভুল করে না, কখনো দুর্বল হয় না, কখনো ঈমানের ওঠানামার মধ্য দিয়ে যায় না। বরং এটি আমাদের মতো মানুষের জন্য। যে মানুষ আজ নামাজ পড়ে, কাল পড়তে পারে না। যে মানুষ আল্লাহর কাছে কাঁদে, আবার কিছুদিন পর আল্লাহকেই ভুলে যায়। যে মানুষ তওবা করে, আবার একই ভুল পুনরায় করে। যে মানুষ ভালো হতে চায় কিন্তু নিজের দুর্বলতার কাছে বারবার পরাজিত হয়। এখানেই বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ আত্মশুদ্ধির কথা বলার সময় মানুষকে নিখুঁত ধরে নেওয়া হয়নি। বরং মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখা হয়েছে। আর মানুষ মানেই অসম্পূর্ণতা।
আমরা কি নামাজ পড়ি নাকি নামাজ আমাদের পড়ে?
নামাজের কথা বললে আমরা সাধারণত কর্তব্যের কথা বলি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ। এটি মুসলিম জীবনের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু নামাজের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কি শুধু কর্তব্যের?
কখনো কখনো মনে হয় আমরা নামাজ পড়ি কিন্তু নামাজ আমাদের কাছে পৌঁছায় না। আমরা দাঁড়াই, রুকু করি, সিজদা করি, সালাম ফিরাই। তারপর আবার সেই একই মানুষ হয়ে উঠি যে মানুষটি কিছুক্ষণ আগে ছিলাম।
কিন্তু নামাজ যদি সত্যিই আমাদের ভেতরে প্রবেশ করে? তাহলে কি আমরা আগের মতোই থাকতে পারি? একজন মানুষ সারাদিন অফিসে কাজ করে। মিটিং, ফোনকল, ইমেইল, হিসাব, মানুষের চাহিদা। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে ক্লান্ত। তার মনে হয় আজ নামাজ পড়ার মতো শক্তি নেই।
আরেকজন মানুষ সারাদিন সংসারের কাজ করে। রান্না, সন্তান, দায়িত্ব, অসংখ্য ছোট ছোট কাজ। দিনের শেষে তার নিজের জন্যও কোনো সময় থাকে না।
আরেকজন মানুষ নিজের ভেতরের দুঃখে এতোটাই ডুবে থাকে যে সে জানে না কীভাবে আল্লাহর কাছে ফিরবে।
তাদের প্রত্যেকের জন্য নামাজের অর্থ এক না। কারও কাছে নামাজ কর্তব্য। কারও কাছে আশ্রয়। কারও কাছে অপরাধবোধ। কারও কাছে ফিরে আসার দরজা।
তারাফুল ধর্মীয় অনুশাসনকে এই মানবিক জায়গা থেকে দেখতে সাহায্য করে। নামাজ কেবল শরীরের কিছু নির্দিষ্ট ভঙ্গি না। এটি মানুষের সমস্ত অহংকার, ব্যস্ততা, ভয় ও অসহায়ত্ব নিয়ে এক সত্তার সামনে দাঁড়ানো।
সিজদার সৌন্দর্য এখানেই। পৃথিবীর সামনে আমরা মাথা উঁচু করে থাকি। সামাজিক অবস্থান, অর্থ, শিক্ষা, সৌন্দর্য, ক্ষমতা, অহংকার, পরিচয় সবকিছু নিয়ে আমরা পৃথিবীতে হাঁটি। কিন্তু সিজদায় এসে মানুষ বুঝতে পারে শেষ পর্যন্ত তার সমস্ত উচ্চতা একটি মাথা নত করার মধ্যেই শান্তি খুঁজে পায়।
আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় মিথ্যা “আমার হাতে এখনো অনেক সময় আছে”
মানুষের সবচেয়ে বড় আত্মপ্রবঞ্চনা সম্ভবত সময় সম্পর্কে। আমরা জানি আমরা মরে যাবো একদিন। কিন্তু সেই জ্ঞান আমাদের জীবনে খুব কমই প্রবেশ করে। আমরা বলি নামাজ পরে পড়বো। সকল ধরণের গুনাহ থেকে পানাহ চাওয়ার জন্য তওবাও পরে করবো। মায়ের সঙ্গে পরে ভালোভাবে কথা বলবো। বাবাকে পরে ফোন করবো। বই পরে পড়বো। ভালো মানুষ পরে হবো। আল্লাহর কাছে পরে ফিরবো।
এই “পরে” শব্দটির ভেতরেই মানুষের অসংখ্য অসম্পূর্ণ জীবন চাপা পড়ে থাকে। একজন মানুষ ভাবে আগামী বছর সে বদলে যাবে। কিন্তু আগামী বছর আসার আগেই তার জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে। একজন ভাবে অবসর নেওয়ার পর সে ইবাদত করবে। কিন্তু অবসর তার জীবনে আসবে কি না সে জানে না। একজন ভাবে যখন জীবনের সমস্যাগুলো কমে যাবে তখন সে আল্লাহর কাছে ফিরবে। কিন্তু জীবনের সমস্যা কখনো পুরোপুরি কমে না বা শেষ হয়না। একটি সমস্যা শেষ হয় তো আরেকটি এসে দাঁড়ায়।
আমরা ভাবি শান্তি এলে আমরা আল্লাহর কাছে ফিরে যাবো। কিন্তু কখনো কখনো সত্যিটা উল্টো। আল্লাহর কাছে আগে বাগে ফিরে গেলেই বরং আমরা শান্তির অর্থ বুঝতে শুরু করি।
মৃত্যুচেতনা মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য না। বরং এটি মানুষকে জীবনের মূল্য বোঝানোর জন্য। আমরা যদি সত্যিই জানতাম আজকের দিনটি হয়তো আমাদের জীবনের শেষ দিন তাহলে কি আমরা একইভাবে কথা বলতাম? একই রাগ ধরে রাখতাম? একই মানুষকে ঘৃণা করতাম? একই অহংকার নিয়ে ঘুমাতে যেতাম? হয়তো না।
মৃত্যু জীবনের বিপরীত না। মৃত্যু জীবনের সীমা। আর সীমা না থাকলে কোনো কিছুর মূল্য থাকে না। একটি বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা না থাকলে তার গল্প শেষ হয় না। একটি দিনের সন্ধ্যা না থাকলে সকালকে আমরা অনুভব করতে পারি না। জীবনের শেষ আছে বলেই প্রতিটি মুহূর্তের একটি গভীরতা আছে। তারাফুল সেই গভীরতার দিকে তাকাতে শেখায়।
ঈমানের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় নিঃসঙ্গতায়
মানুষের সামনে ভালো সাজা সহজ। পরিবারের সামনে ভালো। বন্ধুদের সামনে ভালো। সমাজের সামনে ভালো। কিন্তু মানুষ যখন একা থাকে তখন তার আসল পরিচয় ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে। একজন মানুষ মানুষের সামনে খুব ধার্মিক হতে পারে। কিন্তু একা থাকলে তার চিন্তা কোথায় যায়? একজন মানুষ অনেক সুন্দর করে কথা বলতে পারে। কিন্তু কেউ না দেখলে সে কী করে? একজন মানুষ মানুষের প্রশংসায় অভ্যস্ত হতে পারে। কিন্তু যখন কেউ তার কাজ দেখে না তখনও কি সে ভালো কাজ করতে চায়?
এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর।
কারণ আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে অন্যের চোখের মধ্যে বেঁচে থাকি। কে আমাকে নিয়ে কী ভাবছে? কে আমাকে কতোটা সম্মান করছে? আমার কাজ কে দেখছে? আমাকে কে প্রশংসা করছে?
কিন্তু ঈমানের একটি গভীর পরীক্ষা তখনই শুরু হয় যখন পৃথিবীর কোনো চোখ আমাদের দিকে তাকিয়ে নেই। সেই মুহূর্তে মানুষ ও তার রবের মধ্যে যা থাকে সেটিই সবচেয়ে সত্য। কারণ আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক জনসমক্ষে প্রদর্শন করার বিষয় না। এটা কখনো কখনো এমন এক নীরবতা যার কোনো দর্শক নেই। একটি দুআ যা কেউ শোনে না। এক ফোটা অশ্রু যা কেউ দেখে না। একটা ভুলের পর একা বসে অনুতপ্ত হওয়া। একটা গোপন ভালো কাজ। একটি পাপ থেকে সরে আসা যদিও কেউ জানবে না যে তুমি পাপটি করতে পারতে। সম্ভবত মানুষের সবচেয়ে সুন্দর পরিবর্তনগুলো এমনই নিঃশব্দে ঘটে।
আমরা অনেক সময় আল্লাহকে না, নিজেদেরই হারিয়ে ফেলি
এই বই পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে হয়েছে, মানুষ যখন বলে “আমি আল্লাহকে হারিয়ে ফেলেছি”, তখন হয়তো অনেক সময় সে আসলে নিজের ভেতরের দিকনির্দেশনাটিই হারিয়ে ফেলে।
জীবন তখনো চলে। মানুষ কাজ করে। হাসে। কথা বলে। ছবি তোলে। সফল হয়। কিন্তু ভেতরে একটি অদ্ভুত শূন্যতা থাকে। যেমন একটি বাড়িতে সমস্ত আসবাব আছে কিন্তু কেউ সেখানে বাস করে না। যেমন একটি শহরে হাজার হাজার আলো জ্বলে কিন্তু একটি নির্দিষ্ট জানালার ভেতর অন্ধকার। যেমন একটি মানুষ অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলে কিন্তু নিজের সঙ্গে কথা বলা ভুলে যায়।
আধুনিক জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত এই যে আমরা সবসময় সংযুক্ত কিন্তু খুব কমই সংলগ্ন। আমাদের ফোনে অসংখ্য মানুষ আছে। সামাজিক মাধ্যমে শত শত পরিচিতি আছে। প্রতিদিন অসংখ্য কথা বলি। কিন্তু নিজের আত্মার সঙ্গে কতোক্ষণ কথা বলি?
আমাদের চারপাশের পৃথিবী এতো শব্দে পূর্ণ যে ভেতরের ক্ষীণতম কণ্ঠস্বরটি আমরা শুনতে পাই না। সেই কণ্ঠস্বর কখনো বলে- তুমি ক্লান্ত। তুমি ভুল পথে যাচ্ছ। তুমি ক্ষমা চাও। তুমি ফিরে এসো।
তারাফুল যেন সেই হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরটিকে আবার শোনার একটি আমন্ত্রণ।
একটি বই কখনো কখনো উত্তর দেয় না, প্রশ্ন করে
ভালো বইয়ের একটি বৈশিষ্ট্য হলো তা সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না। বরং কিছু প্রশ্নকে আমাদের ভেতরে রেখে যায়। তারাফুল পড়ার পর যে প্রশ্নগুলো থেকে যায় সেগুলো খুব সহজ না।
আমি কি সত্যিই আল্লাহর ওপর ভরসা করি নাকি শুধু বিপদের সময় তাঁকে স্মরণ করি?
আমার ইবাদত কি আমার চরিত্রকে বদলাচ্ছে?
আমি কি শুধু ধর্ম সম্পর্কে কথা বলি নাকি ধর্ম আমার ব্যবহারেও দেখা যায়?
আমি কি ক্ষমা চাই নাকি শুধু ক্ষমা পাওয়ার আশা করি?
আমি কি অন্যের ভুল দেখি কিন্তু নিজের ভুলকে যুক্তি দিয়ে ঢেকে রাখি?
আমি কি দুনিয়াকে এতো ভালোবাসি যে আখিরাতের কথা মনে পড়লে অস্বস্তি হয়?
আমি কি সত্যিই ব্যস্ত নাকি ব্যস্ততার আড়ালে নিজেকে এড়িয়ে চলি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ মানুষের সবচেয়ে কঠিন বিচারক অন্য কেউ না। সে নিজেই। আর নিজের সামনে দাঁড়ানোর মতো কঠিন আদালত পৃথিবীতে খুব কম আছে।
তারাফুল কেন হৃদয়ে থেকে যায়
এই বইয়ের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো এর বিষয়ের মধ্যে নয় বরং বিষয়ের সঙ্গে পাঠকের ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষমতায়।
আপনি বইটি পড়বেন আর নিজের জীবনের কোনো একটি মুহূর্ত মনে পড়বে। হয়তো এমন একটি রাত যখন আপনি খুব কেঁদেছিলেন। হয়তো এমন একটি সময় যখন আপনি ভেবেছিলেন আপনার দুআ কেউ শুনছে না। হয়তো এমন একটি ভুল যার জন্য আপনি এখনো নিজেকে ক্ষমা করতে পারেননি। হয়তো এমন একজন মানুষ যার কাছে আপনি ক্ষমা চাইতে পারেননি। হয়তো এমন কোনো দিন যখন আপনি খুব দূরে চলে গিয়েছিলেন কিন্তু জানতেন না কীভাবে ফিরে আসবেন।
সাহিত্য তখনই সত্যিকারের ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে যখন পাঠক নিজের জীবনকে তার মধ্যে দেখতে পায়। তারাফুল সেই আয়নার মতো। তবে এই আয়নায় শুধু মুখ দেখা যায় না। এখানে দেখা যায় আমাদের ভেতরটাও। আমাদের অহংকার। আমাদের ভয়। আমাদের অবহেলা। আমাদের অপরাধবোধ। আমাদের ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা। আর সবচেয়ে বড় কথা আমাদের অসম্পূর্ণতার মধ্যেও আলোর সম্ভাবনা।
শেষ কথাঃ ফিরে আসার দরজা কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয় না
মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো সে নিজের ভুলের জন্য নিজেকেই চূড়ান্তভাবে বিচার করে ফেলে। সে ভাবে আমি অনেক দূরে চলে গেছি। আমি অনেক ভুল করেছি। আমার আর ফেরার কোন পথ নেই।
কিন্তু ইসলামের সবচেয়ে সুন্দর আশ্বাসগুলোর একটি হলো মানুষ যতো দূরেই চলে যাক, ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে।
একজন মানুষ বছরের পর বছর নামাজ থেকে দূরে থাকতে পারে। কিন্তু একদিন সে আবার দাঁড়াতে পারে। একজন মানুষ অসংখ্য ভুল করতে পারে। কিন্তু একদিন সত্যিকারের অনুতপ্ত হতে পারে। একজন মানুষ নিজেকে ভেঙে ফেলতে পারে। কিন্তু ভাঙা টুকরো নিয়েও আবার আল্লাহর দিকে ফিরতে পারে। ফিরে আসার জন্য নিখুঁত হওয়া লাগে না। বরং অনেক সময় ফিরে আসার কারণই হয় আমাদের অসম্পূর্ণতা।
আমরা যখন বুঝতে পারি নিজের শক্তিতে সবকিছু সামলানো সম্ভব না তখনই হয়তো প্রথমবার সত্যিকারের আশ্রয়ের দিকে তাকাই। তারাফুল সেই ফিরে আসার বই।
এটি এমন একজন মানুষের জন্য যে এখনো প্রশ্ন করে। যে কখনো বিশ্বাসে শক্ত, কখনো দুর্বল। যে কখনো আল্লাহর খুব কাছে অনুভব করে নিজেকে, আবার কখনো অদ্ভুত দূরত্বে। যে ভালো হতে চায় কিন্তু বারবার ব্যর্থ হয়। যে নিজের ভেতরের অন্ধকার দেখে ভয় পায়। তবুও আলো খোঁজা বন্ধ করে না।
আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এমন কিছু বই দরকার যেগুলো আমাদের নতুন কোনো তথ্য শেখায় না বরং ভুলে যাওয়া সত্যগুলো মনে করিয়ে দেয়। তারাফুল তেমনই একটি বই।
এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা কেবল আমাদের ভুল না। আমরা কেবল আমাদের অতীত না। আমরা কেবল আমাদের ব্যর্থতা না। আমরা এমন মানুষ যারা ফিরে আসতে পারে।আর হয়তো মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই। সে যতোবারই হারিয়ে যাক, তার ভেতরে ফিরে আসার একটি ক্ষীণ অথচ অবিনশ্বর আকাঙ্ক্ষা থেকেই যায়।
কখনো একটি সিজদায়। কখনো একটি দুআ তে। কখনো দু’ফোটা অশ্রুতে। কখনো গভীর রাতের নিঃশব্দ অনুতাপে। আর কখনো একটি বইয়ের পাতায় লেখা কোনো সাধারণ বাক্যের মধ্যে। হয়তো তারাফুল আমাদের সেই কথাটিই মনে করিয়ে দিতে চায়-
আল্লাহর দিকে ফেরার জন্য জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার নেই। কখনো কখনো শুধু এক পা এগিয়ে যাওয়াই যথেষ্ট।
কারণ মানুষ যতই দূরে চলে যাক ফিরে আসার পথ তার জন্য কখনো সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায় না। শুধু একদিন তাকে থামতে হয়। নিজের দিকে তাকাতে হয়। আকাশের দিকে তাকাতে হয়। আর খুব আস্তে করে বলতে হয়- “আমি ফিরে এসেছি।”


