বুক রিভিউঃ দ্য গডফাদার, মারিও পুজো
ক্ষমতার পৃথিবীতে কেউ আপন না আবার কেউ পুরোপুরি পরও না। এখানে ভালোবাসার সঙ্গে মিশে থাকে স্বার্থ, আনুগত্যের পাশে দাঁড়ায় ভয়, আর পরিবারের সুরক্ষার আড়ালে লুকিয়ে থাকে ক্ষমতার নির্মম খেলা।
মারিও পুজোর The Godfather সেই অন্ধকার পৃথিবীর গল্প। যেখানে একজন মানুষ তার পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়ে ধীরে ধীরে এমন এক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে, যে ক্ষমতা একদিন তার নিজের পরিচয়কেই গ্রাস করে ফেলে।
১৯৬৯ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে কর্লিওনে পরিবার। পিতৃপুরুষ ভিটো কর্লিওনে যিনি সবার কাছে পরিচিত দ্য গডফাদার নামে। নিউইয়র্কের অপরাধজগতের এক শক্তিশালী পরিবারকে ঘিরে গড়ে উঠলেও উপন্যাসটির প্রকৃত শক্তি বন্দুক বা সহিংসতায় না। এর শক্তি নিহিত আছে সম্পর্কের জটিলতায়। কে কাকে ভালোবাসলো? কে কাকে ব্যবহার করলো? ক্ষমতা কি মানুষকে বদলে দেয় নাকি মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রবৃত্তিগুলোকে জাগিয়ে তোলে?
এসব প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর পুজো দেন না।
ভিটো কর্লিওনেঃ অপরাধের জগতের এক অদ্ভুত পিতৃমূর্তি
ভিটো কর্লিওনে চরিত্রটি এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর একটি। তিনি অপরাধী। তিনি ক্ষমতার খেলায় নির্মম। তার সাম্রাজ্য আইন ও নৈতিকতার প্রচলিত কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তবু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, কোন রিডার ই তাকে সম্পূর্ণ ঘৃণা করতে পারবে না। কারণ ভিটো নিজেকে কেবল একজন অপরাধী হিসেবে দেখেন না। তার নিজের কাছে তিনি একজন ব্যবসায়ী, একজন পিতা, একজন বন্ধু, একজন আশ্রয়দাতা। তার কাছে পৃথিবী এমন এক জায়গা যেখানে আইন সবসময় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে না। তাই তিনি নিজেই নিজের আইন তৈরি করেছেন।
ভিটো কর্লিওনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ক্ষমতা না, মানুষকে বুঝতে পারার দক্ষতা। তিনি জানেন মানুষ কী চায়। কেউ টাকা চায়, কেউ প্রতিশোধ নিতে চায়, কেউ নিরাপত্তা চায়, কেউ সম্মান চায়। আর ভিটো জানেন মানুষের প্রয়োজনকে কীভাবে আনুগত্যে পরিণত করতে হয়।
তার কাছে কোনো উপকার কখনোই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে না। তিনি সরাসরি মূল্য দাবি করেন না ঠিক তবে সময় এলে মানুষ তার কাছে ফিরে আসতে বাধ্য। এই সম্পর্কের ভেতরে কৃতজ্ঞতা যেমন আছে তেমনি আছে এক ধরনের অদৃশ্য ঋণ।
এখানেই পুজো আমাকে একটি অদ্ভুত প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করান যে-
কোন ভালো কাজ যদি অন্যায় ক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করে তবে সেই ভালো কাজ কি সত্যিই ভালো থাকে?
“পরিবার” শব্দটির ভেতরের আলো ও অন্ধকার
এই উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ সম্ভবত পরিবার।
কর্লিওনে পরিবার একে অপরের জন্য সবকিছু করতে পারে। তাদের এক অপরের প্রতি আনুগত্য গভীর। তাদের বন্ধন অত্যন্ত শক্তিশালী। বিপদের সময় তারা একে অপরের পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু এই পরিবারই আবার অনেক সময় ব্যক্তিস্বাধীনতার সবচেয়ে বড় শত্রু। পরিবারের জন্য তোমাকে নিজের ইচ্ছা ত্যাগ করতে হবে। পরিবারের জন্য তোমাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে যা তুমি ব্যক্তিগতভাবে কখনোই নিতে চাইতে না। পরিবারের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে তোমাকে নিজের নৈতিকতা বিসর্জন দিতে হতে পারে।
এখানে পরিবার ভালোবাসার আশ্রয়ও আবার ক্ষমতার কাঠামোও। পুজো দেখান, পরিবার কখনো কখনো আমাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে। আবার সেই পরিবারই আমাদের এমন এক পরিচয়ের মধ্যে বন্দি করতে পারে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব।
মাইকেল কর্লিওনেঃ যে মানুষটি পালাতে চেয়েছিল
উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর সম্ভবত মাইকেল কর্লিওনের।
মাইকেল শুরুতে পরিবারের অন্যদের থেকে আলাদা। সে শিক্ষিত, সংযত এবং পরিবারের অপরাধজগত থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চায় সবসময়। সে যেন কর্লিওনে পরিবারের ভেতরে জন্ম নেওয়া এমন একজন মানুষ যে নিজের জন্য একটি আলাদা জীবন বেছে নিতে চায়। তার মধ্যে বাবার প্রতি ভালোবাসা আছে কিন্তু বাবার জগতের প্রতি আকর্ষণ নেই।
এখানেই মাইকেলের চরিত্র আমার কাছে অনেক মানবিক হয়ে ওঠে। কারণ আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে নিজেদের পারিবারিক উত্তরাধিকার থেকে আলাদা হতে চাই। আমাদের ওপর যে পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে আমরা কখনো কখনো তার বাইরে গিয়ে নিজেদের আবিষ্কার করতে চাই। তবে জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হলো আমরা যে জিনিস থেকে পালাতে চাই কখনো কখনো পরিস্থিতি আমাদের ঠিক সেখানেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
মাইকেলের ক্ষেত্রেও তাই ঘটে। সে পরিবারের জন্য একটি সিদ্ধান্ত নেয়। তারপর আরেকটি। প্রতিটি সিদ্ধান্তের পর মনে হয় সে এখনও আগের মানুষটি আছে। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারে মানুষ একদিনে বদলে যায় না। মানুষ বদলে যায় ছোট ছোট সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
প্রথমে সে বলে, “আমি কাজটা শুধু এই একবার করবো।” তারপর সেই একবারের পর আরেকবার আসে। একসময় সে আবিষ্কার করে যে পৃথিবী থেকে সে দূরে থাকতে চেয়েছিল সেই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষদের একজন হয়ে উঠেছে সে নিজেই।
মাইকেলের ট্র্যাজেডি এখানেই। সে ক্ষমতা অর্জন করে কিন্তু সেই ক্ষমতার পথে চলতে চলতে নিজের পুরোনো সত্তাকে হারিয়ে ফেলে।
ক্ষমতা মানুষকে কী দেয়?
ক্ষমতা মানুষকে নিরাপত্তা দেয়। অর্থ দেয়। সম্মান দেয়। অন্যের প্রতি ভয় সৃষ্টি করার ক্ষমতা দেয়। কিন্তু ক্ষমতা কি মানুষকে শান্তি দেয়?
The Godfather বারবার দেখায় ক্ষমতা যতো বাড়ে ভয়ের পরিমাণও ততো বাড়ে। যে মানুষ সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী সে-ই হয়তো সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। কারণ তার ই হারানোর মতো সবচেয়ে বেশি আছে।
আজ যে মানুষটি তোমার বন্ধু কাল সে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। আজ যে মানুষ তোমার কাছে সাহায্য চাইছে কাল সে তোমার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। আজ যে মানুষ তোমার পাশে বসে খাবার খাচ্ছে সে হয়তো তোমার পতনের অপেক্ষায় আছে।
ক্ষমতার পৃথিবীতে বিশ্বাস একটি দুর্লভ সম্পদ। আর একারণেই কর্লিওনে পরিবারের মধ্যেও সন্দেহ ঢুকে পড়ে।
পুজো খুব সুন্দরভাবে দেখান যে, ক্ষমতা যখন পরিবারের ভেতরে প্রবেশ করে তখন ভালোবাসাও আর সম্পূর্ণ নির্দোষ থাকে না। কে কাকে রক্ষা করছে? কে কাকে ব্যবহার করছে? কে সত্যিই পরিবারকে ভালোবাসে? আর কে পরিবারের নাম ব্যবহার করে নিজের ক্ষমতা বাড়াচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কখনো সহজ না।
অপরাধের গল্পের আড়ালে আমেরিকান স্বপ্নের গল্প
The Godfather শুধু মাফিয়ার গল্প না। এটি আমেরিকান স্বপ্নের অন্ধকার দিকের গল্পও।
একজন অভিবাসী মানুষ নতুন দেশে আসে। তার কিছু নেই। ধীরে ধীরে সে নিজের জায়গা তৈরি করে। সম্মান অর্জন করে। ক্ষমতা অর্জন করে। নিজের পরিবারের জন্য ভবিষ্যৎ তৈরি করে।
শুনতে এটি সফলতার গল্পের মতো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই সাফল্যের মূল্য কত?
পুজোর উপন্যাসে আমেরিকান স্বপ্নের সঙ্গে অপরাধ জগতের সম্পর্কটি অস্বস্তিকরভাবে স্পষ্ট। বৈধ ব্যবসা, রাজনীতি, পুলিশ, আদালত, সংবাদমাধ্যম, বিনোদনজগত ও অপরাধজগতের সীমারেখা সবসময় ততোটা পরিষ্কার না, যতোটা আমরা ভাবতে চাই।
কর্লিওনে পরিবার আইনকে অমান্য করে কিন্তু আইনসম্মত সমাজের অনেক মানুষও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। কারণ ক্ষমতা সবার কাছেই আকর্ষণীয়।
এই জায়গায় এসে উপন্যাসটি কেবল মাফিয়ার গল্পে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে সমাজের গল্প। কারণ অপরাধী একা ক্ষমতাবান হয় না। ক্ষমতা তখনই টিকে থাকে যখন কোনো না কোনোভাবে সমাজের অন্য অংশও তার সঙ্গে সমঝোতা করে।
তাহলে কি The Godfather ক্ষমতাকে মহিমান্বিত করে?
আমার কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন মনে হয়েছে।
কারণ উপন্যাসটি পড়তে পড়তে কখনো কখনো ভিটো কর্লিওনের ক্ষমতা, মাইকেলের বুদ্ধি কিংবা কর্লিওনে পরিবারের আনুগত্য আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু এই আকর্ষণকে সমর্থন হিসেবে পড়া উচিত না। এখানে পুজো দেখান ক্ষমতার আকর্ষণ কতোটা বিপজ্জনক হতে পারে।
কারণ ক্ষমতা প্রথমে ব্যক্তিকে রক্ষা করে। তারপর ব্যক্তির হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে। এরপর ব্যক্তিকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে যা ব্যক্তি জীবনে কখনো কল্পনাও করেনি।
শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি ক্ষমতার মালিক হয়না। ক্ষমতাই ব্যক্তির মালিক হয়ে যায়।
মাইকেলের গল্পকে আমি তাই ক্ষমতা অর্জনের গল্পের চেয়ে ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণের গল্প হিসেবে বেশি দেখি। সে ভাবতে পারে যে সে পরিবারের জন্যই সবকিছু করছে। কিন্তু একসময় প্রশ্ন জাগে-
পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়ে সে কি নিজের ভেতরের মানুষটিকেই ধ্বংস করে ফেলেছে?
শেষ কথা
The Godfather পড়ে আমার মনে হয়েছে এটি মূলত অপরাধের উপন্যাস না বরং মানুষের উপন্যাস।
এখানে অপরাধ আছে, ক্ষমতা আছে, ষড়যন্ত্র আছে। কিন্তু এর বাইরেও অনেকি কিছু আছে। যেমন আছে বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা। আছে পরিবারের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার প্রবণতা। আছে ক্ষমতার আকর্ষণ। আছে প্রতিশোধের নেশা। আছে নিজের পরিচয় থেকে পালাতে চাওয়া। আছে এমন এক পৃথিবী যেখানে নৈতিকতা সবসময় কালো ও সাদা না।
কিছু মানুষ অন্যায় করে কারণ তারা ক্ষমতা চায়। কিছু মানুষ অন্যায় করে কারণ তারা ভালোবাসে। কিছু মানুষ অন্যায় করে কারণ তারা ভয় পায়। আর কখনো কখনো একজন মানুষ এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয় যা তার কাছে সঠিক মনে হয় কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই ধীরে ধীরে তাকে এমন একজন মানুষে পরিণত করে যাকে সে একসময় ঘৃণা করত।
এই উপন্যাস আমাদের মাফিয়া সম্পর্কে যতোটা বলে মানুষের সম্পর্ক সম্পর্কে তার চেয়েও বেশি বলে। এটি শেখায় পরিবার আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে। আবার সবচেয়ে বেশি দুর্বলতাও। ক্ষমতা আমাদের রক্ষা করতে পারে আবার আমাদের গ্রাসও করতে পারে। আর সবচেয়ে খারাপ পরিবর্তনগুলো কখনো হঠাৎ করে ঘটে না। মানুষ ধীরে ধীরে বদলে যায়। একটি সিদ্ধান্তে। একটি আপসের মুহূর্তে। একটি গোপনীয়তায়। একটি প্রতিশোধে।
তারপর একদিন সে আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে সে আর সেই মানুষটি নেই যে একদিন এই পথ থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিল।


