বুক রিভিউঃ দ্য সেভেন স্পিরিচুয়াল ল’স অফ সাকসেস, দীপক চোপড়া
সব বই কথা বলে না। কিছু বই কেবল পাশে বসে থাকে নীরবে, ধৈর্য নিয়ে। আর সেই নীরব উপস্থিতিতেই আমাদের ভেতরের কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। দীপক চোপড়া’র দ্য সেভেন স্পিরিচুয়াল ল’স অফ সাকসেস ঠিক সেই দ্বিতীয় শ্রেণির, যেখানে প্রতিটি বাক্য পাঠককে একটু থামতে বলে, নিজের ভেতরের দিকে তাকাতে বলে। এটি কোনো প্রচলিত সেল্ফ-হেল্প বই নয়, বরং এটি সফলতা সম্পর্কে আমাদের সাংস্কৃতিক ও মানসিক ধারণাগুলোর এক নিঃশব্দ পুনর্বিন্যাস।
পশ্চিমা সমাজ যেখানে সাফল্যকে মাপে অর্জন, ক্ষমতা ও দৃশ্যমান ফলাফলের নিরিখে, সেখানে চোপড়া সাফল্যের সংজ্ঞাকে ফিরিয়ে নিয়ে যান চেতনা, সবকিছুর সাথে সামঞ্জস্যতা ও আত্মিক পূর্ণতার দিকে। তাই সাফল্য কোনো দৌড় প্রতিযোগিতা নয়, এটি এক ধরনের স্মরণ। নিজের প্রকৃত সত্তাকে মনে রাখার প্রক্রিয়া।
বইটি খুব ছোট হলেও এর ভাবনা গভীর। এটি সাতটি স্পিরিচুয়াল ল’স-এর উপর লেখা। এই ল’স কোনো কঠিন নিয়ম নয়। বরং এগুলো জীবনকে সহজভাবে বোঝার একেকটা পথনির্দেশিকা। লেখক বিশ্বাস করেন, প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখে জীবনযাপন করলে সফলতা আপনা- আপনিই আসে।
সীমাহীন সম্ভাবনার আইন
প্রতিটি মানুষের ভেতরে অসীম সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা যা কিছু হতে পারি, যা কিছু অর্জন করতে পারি, তার বীজ আমাদের ভেতরেই আছে। কিন্তু ব্যস্ততা, ভয়, আত্মসন্দেহ আর বাইরের কোলাহলে আমরা সেই শক্তির সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলি।
কিন্তু নীরবতা, একান্ত সময়, মেডটেশন বা গভীর চিন্তার মাধ্যমে মানুষ নিজের আসল সত্তার কাছাকাছি যেতে পারে। যখন আমরা চুপ করে নিজের ভেতরের কণ্ঠ শুনি, তখন সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
দেওয়ার আইন
জীবন প্রবাহমান। আপনি যত দেবেন, জীবন ততই আপনাকে ফিরিয়ে দেবে। দেওয়া মানে শুধু টাকা- পয়সা না। ভালোবাসা, সময়, মনোযোগ, সহানুভূতি ইত্যাদি সবই দেওয়া।
চোপড়া’র মতে, যদি আপনি কিছু পেতে চান, তাহলে আগে তা দিতে শিখুন। কারণ দেওয়া মানে হলো শক্তির চলাচল বজায় রাখা।
যেমন একজন শিক্ষক যদি শুধু বেতন পাওয়ার জন্য পড়ান, তাহলে তিনি একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়বেন, আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন খুব শিগ্রই। কিন্তু যদি তিনি মন দিয়ে ছাত্রদের সাহায্য করেন, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন তাহলে তিনি সম্মান, ভালোবাসা ও আত্মতৃপ্তি পাবেন। এই মানসিক প্রাপ্তিই বড় সাফল্য।
কর্মের আইন
আপনি যা করবেন, তার ফল আপনাকে পেতেই হবে। ভালো কাজ ভালো ফলাফল আনে আর খারাপ কাজ খারাপ ফলাফল। তাই সবার সচেতনভাবে কাজ করা জরুরি।
তাই প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন-
আমার এই সিদ্ধান্তে কি অন্য কারো হতে পারে?
আমার এই সিদ্ধান্ত কি আমাকে শান্তি দেবে?
যেমন, আপনি রাগের মাথায় কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলেন। এতে হয়তো সাময়িক স্বস্তি পেলেন, কিন্তু সম্পর্ক নষ্ট হলো। আবার আপনি যদি শান্তভাবে কথা বলেন, সম্পর্ক টিকে গেলো। তাই একই কাজ একই পরিস্থিতিতে ভিন্ন ফল আনতে পারে।
কম চেষ্টার আইন
প্রকৃতি কখনো জোর করে কিছু করে না। ফুল ফোটে স্বাভাবিকভাবে, নদী বয়ে চলে নিজের গতিতে। মানুষ যখন অযথা চাপ নেয়, তখনই কষ্ট বাড়ে। তাই অহংকার কমিয়ে, পরিস্থিতি মেনে নিয়ে, স্বাভাবিকভাবে কাজ করলে সাফল্য সহজ হয়।
যেমন, একজন লেখক যদি জোর করে প্রতিদিন নিখুঁত লেখা লিখতে চান, তিনি মানসিক চাপ অনুভব করবেন তা নিশ্চিত। কিন্তু যদি তিনি স্বাভাবিকভাবে লেখেন, ভুল মেনে নেন, আর সেই ভুল থেকে শেখেন তাহলে লেখা ভালো হয় আর সেই কাজে আনন্দ বজায় থাকে সর্বক্ষণ।
ইচ্ছা ও সংকল্পের আইন
আমাদের চিন্তা ও ইচ্ছার শক্তি আছে। আমরা যা গভীরভাবে চাই এবং বিশ্বাস করি, সেটাই ধীরে ধীরে বাস্তব রূপ নেয়। মেনিফেস্টেশন যাকে বলে। তবে তার জন্য সেই ইচ্ছাগুলো যেন পরিষ্কার হয় এবং অন্যের কোন ধরণের ক্ষতির কারণ না হয়।
যেমন, একজন ব্যক্তি যদি মনে মনে বিশ্বাস করেন যে “আমি কিছু করতে পারব না,” তাহলে সত্যিই তিনি থেমে যাবেন। কিন্তু যদি তিনি প্রতিদিন নিজেকে বলেন, “আমি শিখছি, আমি এগোচ্ছি,” তাহলে ধীরে ধীরে তার কাজের সুযোগ তৈরি হবে।
আসক্তি ত্যাগের আইন
ছোট বড় সকল স্বপ্নের প্রতি কিন্সিস্টেন্টলি চেষ্টা করুন, কিন্তু ফলাফলের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেলবেন না। কারন অতিরিক্ত আশা ও ভয় মানুষকে দুর্বল করে। যেকোন কাজের ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিলে মন হালকা থাকে সবসময়। যেমন, একজন পরীক্ষার্থী যদি শুধু রেজাল্ট নিয়ে আতঙ্কে থাকেন, তিনি ভালো করতে পারবেন না। কিন্তু যদি মন দিয়ে পড়েন এবং ফলাফল যাইহোক তা মেনে নিতে প্রস্তুত থাকেন, তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে আর ফলাফল ও ভালো হয়।
জীবনের উদ্দেশ্যের আইন
প্রত্যেক মানুষের জীবনে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। আর সেই উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া ও অন্যের উপকারে ব্যবহার করাই প্রকৃত সাফল্য। যখন মানুষ নিজের কাজকে নিজের উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারে, তখন জীবন অর্থপূর্ণ হয়। চোপড়া’র মতে, নিজের প্রতিভা দিয়ে সমাজের উপকার করলে জীবন অর্থপূর্ণ হয়।
যেমন, একজন মানুষ শুধু টাকা কামাতে চাকরি করেন, কিন্তু তৃপ্তি পান না। আরেকজন মানুষ একই কাজ করেন, কিন্তু মানুষের উপকার করার সুযোগ খুঁজে নেন। দ্বিতীয় ব্যক্তি মানসিকভাবে বেশি সফল।
ব্যক্তিগত মতামত
এটি একটি আধ্যাত্মিক বই কিন্তু অসাধারণ। এখানে আধ্যাত্মিকতা মানে নিজেকে জানা, নিজের মনকে বোঝা এবং জীবনের সঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। এই বই মূলত তাদের জন্য, যারা জীবনে অনেক কিছু করেও শান্তি খুঁজে পান না। যারা ব্যস্ত জীবনে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন।


