বুক রিভিউঃ দ্য আনটেদার্ড সোল, মাইকেল এ. সিঙ্গার
কখনো কখনো মনে হয় আমরা প্রতিটা মানুষই যেন একেকটি ঘর। বাইরে থেকে দেখলে ঘরগুলো বেশ সুন্দর। দেয়ালে রং আছে, জানালায় পর্দা আছে, দরজায় সুন্দর নেমপ্লেট আছে। খুব সুন্দর, পরিপাটি। আমাদের পরিচয়গুলোও যেন সেই ঘরের বাইরের সাজসজ্জার মতো। কেউ ডাক্তার, কেউ মা, কেউ লেখক, কেউ শিক্ষক, কেউ সফল, কেউ ব্যর্থ।
কিন্তু ঘরের ভেতরে?
সেখানে জমে থাকে বহু বছরের অপ্রকাশিত কান্না। কিছু অপমান। কিছু অপ্রাপ্তি। কিছু অসমাপ্ত ভালোবাসা। কিছু দুঃখ। এমন কিছু দরজা যেগুলো আমরা নিজেরাই বন্ধ করে রেখেছি। কারণ একদিন ভুল করে সেগুলো খুলে খুব ব্যথা পেয়েছিলাম বলে।
মাইকেল এ. সিঙ্গারের The Untethered Soul এমন একটি বই যা সেই ঘরের বাইরের সাজসজ্জা নিয়ে খুব বেশি আগ্রহী না বা কথা বলে না। তবে বইটি জানতে চায় ঘরের ভেতরে আসলে কে থাকে। আর একটু গভীরে গেলে প্রশ্নটি আরও বদলে যায়। ঘরটাও কি তুমি? নাকি তুমি সেই নীরব উপস্থিতি যে ঘরটিকে শুধু দেখছে?
বইটি পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে হয়েছে এটি প্রচলিত অর্থে কোনো সেল্ফ-হেল্প বই না। বরং এটি এমন এক বৃদ্ধ মাঝির মতো যে জীবনের দীর্ঘ নদী পাড়ি দিতে দিতে একদিন তোমার পাশে এসে বসে বলে, “তুমি এতোদিন নৌকাটাকেই নিজে ভেবেছো। অথচ তুমি নৌকাও নও, নদীও নও। তুমি সেই সচেতন উপস্থিতি যে সবকিছু ঘটতে দেখছে।”
শুনতে সহজ মনে হলেও এই সত্যকে মেনে নেওয়া আমাদের জন্য খুব কঠিন। কারণ আমরা সাধারণত নিজেদের চিন্তা, দুঃখ, ভয় ও অতীতের সঙ্গে এতো গভীরভাবে একাত্ম হয়ে যাই যে সেগুলোকে নিজেদের পরিচয় বলে মনে করতে শুরু করি। আমাদের মাথার ভেতর যে কণ্ঠস্বরটি সারাক্ষণ কথা বলে অনেক সময় আমরা ভুলে যাই যে সেটি শুধু আমাদের মাথারই একটি কণ্ঠস্বর। বরং আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করি ওই কণ্ঠস্বরটিই যেন আসলে ‘আমি’। মনের ভেতর যে কণ্ঠস্বরটি সারাক্ষণ কথা বলে অনেক সময় আমরা সেটাকেই নিজের আসল সত্তা মনে করি।
কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, এই বইয়ের মূল কথা কী, আমি বলব- আমাদের মাথার ভেতরে অনবরত চলতে থাকা সেই কণ্ঠস্বর না। সে কণ্ঠস্বর যে কখনো থামে না। ঘুমের আগে কথা বলে। সকালে উঠে কথা বলে। আয়নায় তাকালে কথা বলে। অন্যের প্রশংসায় কথা বলে। আর অন্যের সমালোচনায় আরও জোরে কথা বলে। তবে লেখক সেই কণ্ঠস্বরকে চুপ করিয়ে দিতে বলেন না। তার সঙ্গে যুদ্ধ করতেও বলেন না। বরং তিনি বলেন তাকে লক্ষ্য করো। দেখো সে কী বলছে। তার কথা শোনো কিন্তু সে যা বলে তা নিজের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সত্য বলে বিশ্বাস করো না।
এই অংশটি পড়ে আমি দীর্ঘক্ষণ বই বন্ধ করে বসেছিলাম। কারণ হঠাৎ মনে হলো আমার জীবনের অনেক সিদ্ধান্ত হয়তো আমি নিইনি। নিয়েছে আমার ভেতরের সেই অস্থির কণ্ঠস্বর।
যে ভয় পায়। যে সবকিছু তুলনা করে। যে নিজেকে যথেষ্ট মনে করে না। যে অতীতের ক্ষত আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চায়। আর সেই মুহূর্তে বুঝতে পারলাম কোনো দুঃচিন্তা আমার মনে আসছে মানেই সেটি আমি না। কোনো দুঃখ আমি অনুভব করছি মানেই সেই দুঃখ আমার সম্পূর্ণ পরিচয় না। আমি সে মানুষটিও যে নিজের চিন্তা ও দুঃখকে বাইরে থেকে দেখতে পারে, বুঝতে পারে এবং পর্যবেক্ষণও করতে পারে।
আমার কাছে বইটির একটি অসাধারণ ধারণা হলো হৃদয়কে একটি জানালার সঙ্গে তুলনা করা।ভাবুন, একটি পুরোনো বাড়ি। সেই বাড়ির জানালা একসময় অনেক স্বচ্ছ ছিল। জানালা দিয়ে আলো ঢুকত। বাতাস আসত। দূরের আকাশ দেখা যেত। কিন্তু দিন, মাস, বছর পেরিয়ে যেতে যেতে সেই জানালায় ধুলো জমতে শুরু করল। কেউ কষ্ট দিল, একটু ধুলো জমল। কেউ প্রত্যাখ্যান করল, আরও একটু ধুলো জমল। কেউ ভুল বুঝল, আরও কিছু ধুলো জমল।
কাউকে হারালাম, জানালার ওপর জমলো আরও এক স্তর ধুলো। এভাবে একসময় জানালাটা এতোটাই ময়লা হয়ে গেল যে আমরা বাইরের পৃথিবীকেই দোষ দিতে শুরু করলাম। ভাবলাম, পৃথিবী অন্ধকার। আলো নেই। আকাশ মেঘে ঢাকা। জীবন আর সুন্দর না। অথচ হয়তো অন্ধকার পৃথিবীতে ছিল না। অন্ধকার ছিল আমাদের জানালায়। আলো কখনো চলে যায়নি। শুধু আমাদের জমে থাকা কষ্ট, অভিমান আর স্মৃতির ধুলো তাকে দেখতে দিচ্ছিল না।
বইটি বারবার আমাদের সেই জানালার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। মনে করিয়ে দেয় আলো হয়তো এখনও ঠিকই আছে। শুধু আমাদের ভেতরের জমে থাকা কষ্ট, ভয়, প্রতিরোধ ও মানসিক অস্থিরতা সেই আলোকে দেখতে দিচ্ছে না।
এখানেই বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা আসে- ছেড়ে দেওয়া। এই ছেড়ে দেওয়ার অর্থ এই না যে আমি অনেক দুঃখ-কষ্ট পেয়েছি, তাই আর কাউকে ভালোবাসবো না। কারও কাছ থেকে কিছু চাইবো না। অথবা কোনো স্বপ্ন পূরণ হয়নি বলে স্বপ্ন দেখাই বন্ধ করে দেব। বরং ছেড়ে দেওয়া মানে হলো মনের ভেতরে যে প্রতিরোধ তৈরি হয় তাকে আঁকড়ে না ধরা। কষ্ট এসেছে। আমি কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু সেই কষ্টকে আমার সম্পূর্ণ পরিচয় বানিয়ে ফেলবো না। ভয় এসেছে। কিন্তু ভয়ের সঙ্গে আমার পুরো জীবনকে বেঁধে ফেলবো না। আমি কাউকে ভালোবাসি। কিন্তু সেই ভালোবাসাকে অধিকারবোধে পরিণত করবো না। কারণ ভালোবাসা আর অধিকার এক জিনিস না।
আমাদের অধিকাংশ কষ্টের জন্ম হয় এখানেই। আমরা চাই সবকিছু আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী হোক। আমরা চাই মানুষ আমাদের ইচ্ছামতো আচরণ করুক। জীবন আমাদের সব প্রত্যাশা পূরণ করুক। ভাগ্য আমাদের সঙ্গে ন্যায়বিচার করুক। সবকিছু সবসময় আমাদের পক্ষে থাকুক। কিন্তু আমরা ভুলে যাই জীবন আমাদের সঙ্গে কোনো চুক্তিপত্রে সই করেনি। সে নিজের মতোই চলবে।
আর আমরা?
আমরা সারাজীবন ঢেউকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আমার কাছে মনে হয়েছে The Untethered Soul যেন সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে মৃদু কণ্ঠে বলে, “ঢেউ থামানোর চেষ্টা করো না। সাঁতার শিখো।”
কী আশ্চর্য কথা। কতো সরল। কতো কঠিন।
বইটি পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে হয়েছে, মানুষের মনও যেন একটি পুরোনো গুদামঘর। সেখানে বছরের পর বছর ধরে জমা হয় অভিজ্ঞতা। ভাঙা চেয়ার। অপ্রয়োজনীয় বাক্স। ধুলোমাখা স্মৃতি। পুরোনো ভয়। অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা। আমরা নতুন কিছু পেলেই সেই গুদামে ঢুকিয়ে দিই। কিন্তু খুব কম মানুষই কখনো ভেতরে গিয়ে পরিষ্কার করে। ফলে একসময় গুদামঘরটি এতোটাই ভরে যায় যে সেখানে চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষের মনও তেমন। তবে The Untethered Soul আমাদের নতুন আসবাবপত্র এনে দিতে চায় না। বরং বলে যা অপ্রয়োজনীয় তা সরিয়ে ফেলো। জায়গা তৈরি করো। বাঁচার জন্য। শ্বাস নেওয়ার জন্য। আলো ঢোকার জন্য।
এখানেই বইটির আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। কারণ বইটি আমাকে নতুন কেউ হতে বলে না। বরং আমি যা নই সেগুলোকে ধীরে ধীরে চিনতে শেখায়। আমার ভয় আমি না। আমার অতীত আমি না। আমার ক্ষত আমি না। আমার চিন্তা আমি না। আমার ভেতরে যে কণ্ঠস্বরটি কথা বলে, সেটিও আমার সম্পূর্ণ সত্তা না। হয়তো আমি তখনই নিজের প্রকৃত সত্তার দিকে তাকাতে শুরু করি যখন বুঝতে পারি আমি আসলে কী কী নই।
The Untethered Soul মূলত মানুষের অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতার কথা বলে। এমন এক স্বাধীনতা যা বাইরের পরিস্থিতি সবসময় ঠিকঠাক থাকার ওপর নির্ভর করে না। যদি আমাদের শান্তি নির্ভর করে সবকিছু ঠিকঠাক থাকার ওপর তাহলে আমরা কখনোই পুরোপুরি শান্ত হতে পারব না। জীবন কখনো পুরোপুরি ঠিক থাকে না। কোনো না কোনো দুঃখ জীবনে আসবে। কোনো না কোনো সম্পর্ক বদলাবে। কোনো পরিকল্পনা ভেঙে যাবে। কোনো স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যাবে। কখনো শরীর ভেঙে পড়বে। কখনো প্রত্যাশা ভেঙে যাবে। জীবন চলতে থাকলে ভাঙনও চলতে থাকবে। তবু কিছু মানুষ ঝড়ের মাঝেও এক ধরনের স্থিরতা ধরে রাখতে পারে। এই বই আমাকে সেই স্থিরতার একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছে।
সিঙ্গারের ‘দর্শক’- ধারণাটি পরের দিকে আমার কাছে যেন আকাশের উপমায় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা সবাই যেন একেকটি আকাশ। আর আমাদের চিন্তাগুলো মেঘ। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে আমরা আকাশ। সারাদিন মেঘ নিয়ে ব্যস্ত থাকি। কোন মেঘ কালো। কোন মেঘ সাদা। কোন মেঘ সুন্দর। কোন মেঘ ভয়ংকর। কিন্তু আকাশ কখনো মেঘের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। মেঘ আসে। মেঘ যায়। আকাশ থাকে।
আমাদের চিন্তা, অনুভূতি, ভয়, দুঃখ এবং আনন্দও তেমন। তারা আসে এবং চলে যায়। তবে তাদের প্রত্যেককে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় মনে করার কোন প্রয়োজন নেই। এই বইয়ের পাতায় পাতায় আমি সেই আকাশের সন্ধান পেয়েছি।
তবে বইটির শক্তি শুধু তার যুক্তিতে না তার উপস্থিতিতেও। এটা অনেকটা এমন একজন বন্ধুর মতো যে আমার সমস্যার সমাধান দিতে আসে না। শুধু পাশে বসে থাকে। আর সেই উপস্থিতিই ধীরে ধীরে আমাকে বদলে দেয়। বইটি পড়া শেষ করার পর আমার মনে হয়নি আমি সম্পূর্ণ নতুন কিছু শিখেছি। মনে হয়েছে আমি এমন কিছু মনে করতে পেরেছি যা হয়তো অনেক আগে থেকেই জানতাম। যেন আত্মার ভেতরে কোথাও একটি পুরোনো ঘণ্টা ঝুলছিল। বইটি এসে সেটিকে আলতো করে ছুঁয়ে দিয়েছে কেবল। আর সেই শব্দ এখনও বাজছে। খুব আস্তে। হৃদয়ের খুব গভীরে।
তাই The Untethered Soul শেষ পর্যন্ত আমার কাছে নিজেকে নিজের তৈরি মানসিক বন্ধন থেকে মুক্ত করার একটি বই। এই মুক্তি বাইরের কোনো শিকল ভেঙে ফেলার মুক্তি না। বরং বইটি সেই শেকলের কথা বলে যেগুলো আমরা নিজেরাই নিজেদের চারপাশে বেঁধেছি। ভয় দিয়ে। অহংকার দিয়ে। স্মৃতি দিয়ে। আকাঙ্ক্ষা দিয়ে। অপ্রাপ্তি দিয়ে। তারপর ভুলে গেছি যে শেকলগুলো আমাদেরই বানানো।
তাই বইটি আমার কাছে এমন কোনো রড কাটার মনে হয়নি যা এসে শেকল কেটে দেয়। একটি আয়নার মতো মনে হয়েছে। যেখানে তাকিয়ে আমরা প্রথমবার দেখতে পাই শেকলগুলো আসলে কোথায়। আর হয়তো সেখান থেকেই শুরু হয় মুক্তি। ধীরে ধীরে। নিঃশব্দে। একটি আত্মার পবিত্র পথের দিকে যাত্রার মতো। যে এতোদিন খাঁচার ভেতর থেকে আকাশ দেখছিল। আজ প্রথমবার বুঝতে পারছে আকাশ কখনো তার কাছ থেকে দূরে ছিল না। বরং আকাশ তো তার ভেতরেই ছিল।


