একজন মানুষের স্বপ্ন কতো দূর পর্যন্ত যেতে পারে তার কোনো মানচিত্র হয় না। তার শুরুটা হয়তো খুব ছোট একটি ঘরে, খুব সাধারণ একটি পরিবারে। অথবা এমন কোনো শহরে যেখান থেকে পৃথিবীর বড় স্বপ্নগুলোকে অসম্ভব বলে মনে হয়। কিন্তু স্বপ্নের নিজস্ব এক ধরনের জেদ আছে। তাকে যতো লিমিটেশনের মধ্যে রাখা হয় সে ততো দূরের আকাশের দিকে তাকাতে শেখে।
এ পি জে আবদুল কালামের Wings of Fire সেই স্বপ্নেরই এক জার্নি’র গল্প। রামেশ্বরামের এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা একটি ছেলে কীভাবে অধ্যবসায় ও অসংখ্য মানুষের সহযোগিতায় ভারতের মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠলেন বইটি তারই স্মৃতিচিত্র।
তবে উইংস অব ফায়ার কেবল একজন বিজ্ঞানীর সাফল্যের কাহিনি না। এই বইয়ের গভীরে আছে একজন মানুষের বেড়ে ওঠার গল্প। যে শিখেছিল সীমিত সামর্থ্য স্বপ্নের সীমা নির্ধারণ করে না। যে বুঝেছিল ব্যর্থতা কোনো দরজা বন্ধ করে দেওয়ার নাম না। বরং অন্য আরেকটা দরজা খুঁজে নেওয়ার আহ্বান।
সহলেখক অরুণ তিওয়ারির সঙ্গে লেখা এই আত্মজীবনী কেবল একজন বিজ্ঞানীর সাফল্যের কাহিনি বলে না। এটি রামেশ্বরমের এক সাধারণ পরিবারের ছেলের ধীরে ধীরে বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার গল্প বলে। তবে আমার কাছে এটা গল্পের চেয়েও একটি স্বপ্ন কীভাবে একজন মানুষকে তার বর্তমান বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করতে শেখায় সেই গল্প।
কালামের জীবনের শুরুতেই আমরা এমন একটি ভারতকে দেখি যেখানে সুযোগ ছিল সীমিত কিন্তু কৌতূহলের কোনো সীমা ছিল না। রামেশ্বরমের ছোট্ট শহর, সাধারণ পরিবার, সংবাদপত্র বিলির কাজ, শিক্ষক, বন্ধুত্ব ও শৈশবের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা মিলেই তৈরি হয়েছিল তার পৃথিবী। পরবর্তীকালে তার জীবন যতো বড় হয়েছে সেই শৈশব ততোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ বড় স্বপ্নের শিকড় প্রায়ই খুব সাধারণ মাটিতেই জন্ম নেয়।
এই বই পড়তে গিয়ে আমার বারবার মনে হয়েছে আমরা সাফল্যের গল্পগুলোকে প্রায়ই ভুলভাবে পড়ি। আমরা শেষটুকু দেখি শুরুটা না। একজন মানুষ কোথায় পৌঁছেছেন সেটা আমাদের চোখে পড়ে ঠিকই। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগে কতো শতবার তিনি সংশয়, সীমাবদ্ধতা কিংবা ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছেন সেটা আমরা সহজেই ভুলে যাই। তবে কালামের গল্প সেই ভুলটি ভাঙে।
তিনি প্রথম থেকেই কোনো অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী নায়ক হিসেবে হাজির হন না। বরং তার জীবনের শক্তি তৈরি হয়েছে শেখার আগ্রহ, অধ্যবসায়, ভালো শিক্ষক পাওয়া, সহকর্মীদের কাছ থেকে শেখা সর্বোপরি নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার ইচ্ছা থেকে।
বিশেষ করে তার শিক্ষকদের কথা উইংস অব ফায়ার কে এক অন্যরকম কোমলতা দেয়। একজন শিশুর ভবিষ্যৎ কখনো কখনো তার নিজের কল্পনার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে। কারণ কোনো একজন শিক্ষক তার মধ্যে সেই সম্ভাবনাটি দেখতে পান বলে। কালামের জীবনেও এমন মানুষ ছিলেন যারা তাকে শুধু পড়াননি বরং তার সামনে এক বৃহত্তর পৃথিবীর দরজা খুলে দিয়েছিলেন।
কখনো কখনো একজন শিক্ষক একটা মানুষের জীবনে একটি সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ তৈরি করে দিতে পারেন।
কালামের বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার পথও সরল ছিল না। তিনি বিমান প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করেন। প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে ভারতের মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন। কিন্তু Wings of Fire-এর আকর্ষণ শুধু এসব অর্জনের তালিকায় না। বরং আকর্ষণীয় হলো প্রতিটি অর্জনের পেছনে থাকা মানুষগুলো এবং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।
বইটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বড় কোনো বৈজ্ঞানিক সাফল্য আসলে একজন মানুষের একক বিজয় না। যেমন একটি রকেট আকাশে ওঠার পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের শ্রম। কেউ নকশা করেন, কেউ পরীক্ষা করেন, কেউ ত্রুটি খুঁজে বের করেন, কেউ আবার ব্যর্থতার পর নতুনভাবে শুরু করেন। কালামের আত্মজীবনীতে তাই ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি একটি দল, একটি প্রতিষ্ঠান এবং একটি দেশের স্বপ্নও উঠে আসে।
সম্ভবত এ কারণেই বইটির নাম Wings of Fire এতো অর্থবহ।
ডানা আমাদের উড়তে সাহায্য করে। তবে শুধু ডানা থাকলেই উড়ে যাওয়া যায় না। প্রয়োজন দিক, সাহস এবং কখনো কখনো আগুনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি।
কালামের জীবনে ব্যর্থতা এসেছে। পরীক্ষামূলক প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে। অনেক পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া যায়নি। তবে তার গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যর্থতাকে তিনি নিজের পরিচয় হতে দেননি।
আমরা অনেক সময় ভাবি, সফল মানুষ মানেই তারা যারা ব্যর্থ হননি। অথচ কালামের জীবন দেখায় সফল মানুষ সম্ভবত তারা যারা ব্যর্থতার পরও শেখার ক্ষমতা হারাননি। এই পার্থক্যটুকু বুঝতে পারা খুবই জরুরী। কারণ ব্যর্থতা আমাদের শুধু একটি ফলাফল দেয় না, আমাদের সামনে একটি প্রশ্নও রাখে- এখন কী?
কালামের জীবনের উত্তর ছিল, আবার চেষ্টা করা। আর সেই আবার চেষ্টা করার শক্তির সঙ্গে যুক্ত ছিল তার স্বপ্নের ধারণা। তার কাছে স্বপ্ন মানে ঘুমের মধ্যে দেখা কোনো ছবি না। স্বপ্ন মানে এমন একটি ভবিষ্যৎ যার জন্য বর্তমানকে পরিবর্তন করতে হয়।
আমরা প্রায়ই স্বপ্নকে খুব দূরের কোনো জিনিস হিসেবে দেখি। ভাবি, পরিস্থিতি ভালো হলে কাজ শুরু করবো। সময় পেলে পড়বো। যেদিন আত্মবিশ্বাস আসবে সেদিন চেষ্টা করবো। কিন্তু Wings of Fire যেন উল্টো কথা বলে- শুরু করার আগেই আত্মবিশ্বাসের সম্পূর্ণ উপস্থিতির দরকার নেই। কাজ করতে করতেই আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।
আর এই কারণেই কালামের গল্প শুধু বিজ্ঞানীদের জন্য। একজন শিক্ষার্থী, একজন শিক্ষক, একজন অভিভাবক, একজন স্বপ্নহীন হয়ে পড়া মানুষ, এমনকি বহু বছর ধরে নিজের কোনো অসমাপ্ত ইচ্ছা বয়ে নিয়ে চলা মানুষও এই বইয়ের মধ্যে নিজের একটি অংশ খুঁজে পেতে পারেন।
আমার কাছে বইটির সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি হলো এর বিনয়।
কালাম এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন যেখানে তার নাম জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। তবু তার আত্মজীবনীর কেন্দ্রে ব্যক্তিগত অহংকারের চেয়ে মানুষ, শিক্ষা, বিজ্ঞান, দেশ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তার ভাবনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ফুটে উঠেছে।
তিনি দেখিয়েছেন, বড় হওয়া মানে অন্যদের চেয়ে উঁচুতে দাঁড়ানো না। বরং নিজের ক্ষমতাকে এমন কোনো কাজে ব্যবহার করা যা নিজের জীবনের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য মানুষের জীবনেও অর্থ তৈরি করে।
সম্ভবত এই কারণেই Wings of Fire শেষ করার পর একটি সহজ উপলব্ধি থেকে যায়-
আমাদের জন্মপরিস্থিতি আমাদের ভবিষ্যতের প্রথম অধ্যায় হতে পারে, কিন্তু শেষ অধ্যায় না।
রামেশ্বরামের এক সাধারণ ছেলের গল্প শেষ পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন পর্যন্ত পৌঁছেছিল। কিন্তু সেই যাত্রার আসল সৌন্দর্য রাষ্ট্রপতি হওয়ায় ছিলোনা। সৌন্দর্য হলো পথে তিনি তার কৌতূহল হারাননি। হয়তো মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এটাই।
বয়স বাড়ে। দায়িত্ব বাড়ে। বাস্তবতা আমাদের শেখায় কী সম্ভব আর কী অসম্ভব। ধীরে ধীরে আমরা নিজেরাই নিজের জন্য সীমারেখা আঁকি। যে শিশুটি একদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন করতো, বড় হতে হতে সে হয়তো শুধু মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটতে শেখে।
কিন্তু Wings of Fire নিজেদের ভেতর থাকা সেই শিশুটির দিকে আবার তাকাতে শেখায়। বলে, স্বপ্ন দেখার জন্য নিখুঁত জীবনের দরকার নেই। দরকার একটি কৌতূহলী মন, কিছু মানুষের বিশ্বাস, নিজের কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং ব্যর্থতার পরও উঠে দাঁড়ানোর সাহস।
আমরা কোথা থেকে এসেছি তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা কোথায় যেতে চাই। আর সেই পথে প্রতিদিন কতোটুকু হাঁটতে প্রস্তুত।
আকাশ কখনো আমাদের প্রতিশ্রুতি দেয় না যে উড়ে যাওয়া সহজ হবে। কিন্তু কিছু মানুষ তাদের জীবন দিয়ে দেখিয়ে যান ডানা কিভাবে তৈরি করা যায়।
তারপর একদিন, খুব সাধারণ একটি মানুষও নিজের সীমার ওপরে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে পারে- আমার স্বপ্নটি হয়তো আমার চেয়েও বড় ছিল। তাই আমাকে বড় হতে হয়েছে তার কাছে পৌঁছানোর জন্য।



Very well written.